সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১১:২০ পূর্বাহ্ন

উপনিবেশোত্তর বাংলাদেশে জাতিরাষ্ট্র গঠন ও সংকটের স্বরূপ

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২৩ সময় দেখুন

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রধান ভূমিকা থাকলেও এর পেছনে এদেশের অবাঙালি সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীসমূহের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণের ইতিহাস রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য সাহসিকতার স্বাক্ষর রেখে অনেক অবাঙালি যোদ্ধা রাষ্ট্রীয় খেতাবে ভূষিত হয়েছিলেন। তবে ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের সময় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কেবল ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’কে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করে। সংবিধানের সেই অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়, “ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত একক সত্তাবিশিষ্ট যে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ ও সংকল্পবদ্ধ সংগ্রাম করিয়া জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন করিয়াছেন, সেই বাঙালি জাতির ঐক্য ও সংহতি হইবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি।” এই বয়ান থেকে এটি স্পষ্ট যে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাংলাদেশের বাঙালিকে আলাদা করতে এই জাতীয়তাবাদকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল। কিন্তু এর ফলে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অন্যান্য সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর জাতিগত ও গোষ্ঠীগত স্বীকৃতি সাংবিধানিকভাবে উপেক্ষিত থেকে যায়। আমরা আগেই বলেছি, বাংলাদেশের সশস্ত্র স্বাধীনতাযুদ্ধের পেছনে প্রধানত বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনা সক্রিয় থাকলেও, দেশটির অপরাপর অবাঙালি সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীসমূহের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ সেই মরণপণ যুদ্ধে নানাভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। অবাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে কেউ কেউ এমনকি অসমসাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য স্বাধীনতা-উত্তর সরকারের কাছ থেকে স্বীকৃতি হিসেবে রাষ্ট্রীয় খেতাবও অর্জন করেছিলেন। সাংবিধানিকভাবে গৃহীত এই জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা নিরূপণ করেলেখা হয়, “ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত একক সত্তাবিশিষ্ট যে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ ও সংকল্পবদ্ধ সংগ্রাম করিয়া জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন করিয়াছেন, সেই বাঙালি জাতির ঐক্য ও। 286. অর্থাৎ বাংলাদেশের অধিবাসী বাঙালি জনগোষ্ঠীর জাতীয়তাবাদই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জাতীয়তাবাদ। কিন্তু অগ্রে জাতি ভাষা না শিখিয়া পরের ভাষা শিখা কোনও মতে উচিত নহে।”২৯০ তথ্যসূত্র: ২৮৬ দেখুন, প্রাগুক্ত, ১৯৭২, অনুচ্ছেদ ৯ ২৮৭ আনিসুজ্জামান, “আমাদের মুক্তিসংগ্রাম ও সংবিধানের মূলনীতি”, বাঙালী ও বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা: ১১৪। 124 ২৮৯ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, ২০১১, অনুচ্ছেদ ৬[২] ২৯০ ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা, “বাক্যকথন – ভাষা”, বোধোদয়, পৃষ্ঠা: ৩২।

স্বাধীনতার পর শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে একধরণের উগ্র জাতীয়তাবাদী মানসিকতা পরিলক্ষিত হয়। তৎকালীন নেতা শেখ মুজিবুর রহমান অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীগুলোকে বাঙালিদের সাথে একীভূত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমাসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে ‘উপজাতি’ বা ‘ট্রাইব’ হিসেবে অভিহিত করে তাদের প্রতি এক ধরনের ঔপনিবেশিক মানসিকতা প্রদর্শন করা হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শাসকশ্রেণির এই দৃষ্টিভঙ্গি ছিল উগ্র বর্ণবাদী ও ফ্যাসিবাদী চিন্তাধারার বহিঃপ্রকাশ, যা বিশ শতকের প্রথমার্ধে হিটলারের নেতৃত্বাধীন জার্মান শাসকগোষ্ঠীর চিন্তার সাথে তুলনীয়। পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের সরকার এই নীতি পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ প্রবর্তন করে, যা সমস্ত জাতিগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি হয়েছিল। তবে এরপরেও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ বা ‘উপজাতি’র মতো নেতিবাচক বিশেষণের ব্যবহার অব্যাহত থাকে। শুধু তা-ই নয়, স্বাধীনতা-উত্তর বাঙালি শাসকশ্রেণির ‘জাতিবাদী’ আত্মাভিমান এমন উৎকট পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, এই শাসকশ্রেণি অবাঙালি সংখ্যালঘু জাতিসত্বাগুলোকে ‘উপজাতি’র অধস্তন মর্যাদায় চিহ্নিত করে এবং সেই শাসকশ্রেণির প্রধান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এদেশের অবাঙালি। 287. ‘নিছক ট্রাইব’ আখ্যায়িত করে, মুজিব নিজের কথিত‘ঔদার্যবশত’ তাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে ‘প্রমোশন’ দেয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছিলেন।২৮৮ মুজিব ও লীগের তরফে এই ‘ঔদার্য’ প্রদর্শনের আকাঙ্ক্ষা আসলে ছিল বর্ণবাদী ঔপনিবেশিক চিন্তার অনুবর্তী এক উগ্র ‘জাতিবাদী’ রাজনীতির উৎকট অভিপ্রকাশ। অন্যদিক থেকে দেখলে, জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববাদ যদি ফ্যাসিবাদী ভাবাদর্শের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক উপাদান হয়ে থাকে – বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে হিটলারের নেতৃত্বাধীন জার্মান শাসকশ্রেণীর চিন্তার মধ্যে আমরা যেমন দেখতে পাই – তাহলে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে স্বাধীনতা-উত্তর। ২৮৮ Dr. Mizanur Rahman Shelley (ed। বলার অপেক্ষা রাখেনা, এই সব উৎকৃষ্টতাবাদী জাতিবাদ ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা মূলত আধিপত্যবাদ এদেশের শাসকশ্রেণীর ঔপনিবেশিক চিন্তা-চেতনারই বিভিন্ন অভিপ্রকাশ মাত্র।

২০১১ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে এক পরস্পরবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করে। সেখানে বলা হয়েছে, “বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালি এবং নাগরিক হিসাবে বাংলাদেশি বলিয়া পরিচিত হইবেন।” এর মাধ্যমে অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীকেও সাংবিধানিকভাবে ‘বাঙালি’ পরিচয়ের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একইসাথে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রাখা এবং রাষ্ট্রকে ধর্মনিরপেক্ষ ঘোষণা করার বিষয়টিও ছিল রাজনৈতিক ও আদর্শিক দিক থেকে সাংঘর্ষিক। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূলনীতি যখন সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মকে বিশেষ মর্যাদা দেয়, তখন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অবস্থান নিচে নেমে যায়। এই ধরনের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অবস্থানকে ঔপনিবেশিক চিন্তারই ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হয়। “বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালি এবং নাগরিক হিসাবে বাংলাদেশি বলিয়া পরিচিত হইবেন।”২৮৯ স্পষ্টতই, বাংলাদেশের জনগণের অংশ হিসেবে, অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীসমূহের জাতীয় পরিচয়ও ‘বাঙালি’ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত থাকে। একদিকে লীগ কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্রের একটি মূলনীতি হিসেবে ‘ধর্মনিরপেক্ষতাকে’ ফিরিয়ে আনে, অন্যদিকে ইসলামকে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ হিসেবে অক্ষুণ্ন রাখে। একটি রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ও ‘ধর্মীয়প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে বিকশিত করার ধারণাটি হাস্যকর বটে। সর্বোপরি, যে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান তার সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকদের ধর্ম-বিশ্বাসকে ‘রাষ্ট্রীয় মর্যাদা’ দান করে সংখ্যালঘু নাগরিক সম্প্রদায় সমূহের ধর্ম বিশ্বাসকে অধস্তন স্তরে নামিয়ে আনে, সে প্রতিষ্ঠানকে নিশ্চয় ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ হিসেবে বিবেচনা করার অবকাশ থাকে না।

দীর্ঘ পাঁচশ বছরেরও বেশি সময় ধরে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকার দেশগুলোতে ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার পরিবর্তনের মাধ্যমে তাদের আধিপত্য বজায় রেখেছিল। এই ঔপনিবেশিক শাসন আজও বিভিন্ন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে কেবল পুরনো শক্তির সমালোচনা করলেই চলবে না, বরং নতুন প্রজন্মের উচিত উপনিবেশবাদের এই বিষফল থেকে বেরিয়ে এসে একটি সৃজনশীল রাষ্ট্র গঠন করা। সমতাভিত্তিক গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণে জনগণের মন ও মননের বিউপনিবেশায়ন এখন সময়ের দাবি। পুরনো জাতিবাদী চিন্তার খোলস ভেঙে নতুন ইতিহাস গড়ার মাধ্যমেই কেবল প্রকৃত গণতান্ত্রিক মুক্তি অর্জন করা সম্ভব বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি ৩৪। আমরা এই দীর্ঘ প্রবন্ধে দীর্ঘক্ষণ ধরে দেখেছি, ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ নিজেদের স্বার্থে এশিয়া, আফ্রিকা এবং উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার নানা দেশে, ৫০০ বছরেরও বেশী সময় ধরে, ইতিহাস-চর্চা, ভাষা ও শিক্ষার উপনিবেশবাদী রাজনীতির ম। The Chittagong Hill Tracts of Bangladesh: The Untold Story, p। সেই ঔপনিবেশিক শোষন-শাসন ও নিপীড়নের দীর্ঘস্থায়ী বিষফল উপনিবেশোত্তর দেশ ও রাষ্ট্রসমূহের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনকে নেতিবাচকভাবে কিভাবে প্রভাবিত করেছে, করে চলেছে এখনো, তাও এই প্রবন্ধে আলোচিত হয়েছে। উপনিবেশোত্তর যে-কোনো সমাজের বিশেষত তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য এই ইতিহাস জেনে রাখা শুধু নয়, নিরন্তর মনে রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই ইতিহাস পাঠ ও বিশ্লেষণের গুরুত্ব নিশ্চয় পুরনো ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহকে নিরন্তর অভিসম্পাত করে সেই পুরনো ইতিহাসের ভেতরেই নিজেদের বন্দী থাকার মধ্যে হতে পারে না, বরং আপন আপন দেশে সমতাভিত্তিক গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তোলার লক্ষ্যে, পুরনো ঔপনিবেশিক। এ প্রবন্ধে আলোচিত ইতিহাস ও তার বিশ্লেষণের আলোকেএ কথা অতএব নিশ্চিত ভাবে বলা যেতে পারে যে, বাংলাদেশসহ উপনিবেশোত্তর দেশগুলোকে যথার্থ গণতান্ত্রিক মুক্তি অর্জন করতে হলে, সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রসমূহকে উপনিবেশবাদী ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষানীতি,উৎকৃষ্টতাবাদী জাতিচিন্তা ও। নয় এবার অতি সংক্ষেপে কয়েকটি সতর্কতামূলক প্রতিপাদ্য উপস্থাপন করেবর্তমান রচনাটির ইতি টানব। প্রথমত, আমরা ইতিপূর্বে বলেছি, আমাদের উপনিবেশোত্তর দেশগুলোর সমাজ ও রাষ্ট্রের যথার্থ গণতান্ত্রিক মুক্তির জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে তাদের আপন আপন ইতিহাসকে পশ্চিমা উপনিবেশবাদী বয়ান থেকে মুক্ত করে, বস্তুনিষ্ঠ গবেষণার ভিত্তিতে, নিজেদের ইতিহাসের পুনর্গঠন করতে হবে।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর