নেত্রকোনা জেলা শহরে যানজট এখন নিত্যদিনের ভোগান্তির নাম। মাত্র দুই কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতেই অনেক সময় এক ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লেগে যাচ্ছে। এই যানজটের পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক ও মিশুকের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল। ১৮৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই পৌরসভার আয়তন ২১ দশমিক ২ বর্গকিলোমিটার এবং ৯টি ওয়ার্ডে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার মানুষের বসবাস। ৯৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কের এই ছোট শহরে যানবাহনের আধিক্য জনজীবনকে স্থবির করে তুলছে। যানজট নিয়ে স্থানীয় ১০ বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলেছে। নেত্রকোনা পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৮৮৭ সালে গঠিত এ পৌরসভার আয়তন ২১ দশমিক ২ বর্গকিলোমিটার। পৌর এলাকায় মোট ৯৩ কিলোমিটার সড়ক আছে। এসব সড়কের দুই পাশে বাজার, বিপণিবিতান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, সরকারি-বেসরকারি দপ্তর ও হাসপাতাল আছে।
পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, শহরে নিবন্ধিত ইজিবাইক, মিশুক ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা ৫ হাজার ৬৫৯। তবে স্থানীয়দের ধারণা, বাস্তবে এই সংখ্যা সাড়ে সাত হাজারের বেশি। স্থানীয়রা জানান, আটজন যাত্রী বসার মতো বড় আকারের অটোরিকশায় অনেক সময় মাত্র দুই থেকে চারজন যাত্রী নিয়ে চলাচল করে, যা সড়কে অহেতুক জায়গা দখল করে যানজট বাড়াচ্ছে।
ভুক্তভোগী নগরবাসীদের একজন, জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ের কর্মচারী হেলেনা খাতুন। তিনি জানান, তার বাসা থেকে কর্মস্থল মোক্তারপাড়ার দূরত্ব মাত্র দুই কিলোমিটার। আগে রিকশা বা ইজিবাইকে ১৫ মিনিটের মধ্যে পৌঁছাতে পারলেও এখন যানজটের কবলে পড়ে তার এক ঘণ্টা সময় ব্যয় হচ্ছে। একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন বনোয়াপাড়ার আবু আব্বাছ ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী রাঈক সাফওয়ান। তার বাসা থেকে তিন কিলোমিটার দূরত্বের কলেজে যেতে তাকে এক থেকে দেড় ঘণ্টা রাস্তায় কাটাতে হয়। তিনি বলেন, আগে ইজিবাইক বা রিকশায় করে অফিসে যেতে তাঁর সর্বোচ্চ ১৫ মিনিট লাগত।
শহরের বনোয়াপাড়া মোড়, মোক্তারপাড়া সেতু, রাজুরবাজার, তেরিবাজার, সাতপাই চানখার মোড়, আখড়া মোড় এবং বড়বাজার সংলগ্ন এলাকাগুলোতে যানজট ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এছাড়া নেত্রকোনা সরকারি কলেজ, এম আকন্দ কামিল মাদ্রাসা ও নেত্রকোনা উচ্চবিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে সকাল ও বিকেলে ছুটির সময়ে ব্যক্তিগত গাড়ির পার্কিং যানজটকে আরও প্রকট করে তোলে। এ ছাড়া তেরিবাজার থেকে সাতপাই চানখার মোড় পর্যন্ত ২ কিলোমিটার, আখড়া মোড় থেকে বড়বাজার হয়ে মালনী মোড় পর্যন্ত প্রায় ৬০০ মিটার এবং মোক্তারপাড়া সেতু এলাকা থেকে পারলা বাসস্টেশন পর্যন্ত এলাকায় দিনের বিভিন্ন সময়ে যানজট হয়।
জেলা ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক মাহবুবুর রহমান জানান, সড়কের সক্ষমতার চেয়ে যানবাহনের সংখ্যা অনেক বেশি বেড়েছে। যত্রতত্র যাত্রী ওঠানো-নামানো এবং রাস্তার পাশে বাজার বসার কারণে ট্রাফিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। তার মতে, কেবল পুলিশ দিয়ে এই সমস্যার টেকসই সমাধান সম্ভব নয়; প্রয়োজন পৌরসভাসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ।
তবে স্থানীয়রা কেবল অটোরিকশাকে দায়ী করছেন না। ছোট বাজার এলাকার বাসিন্দা আজাহারুল ইসলাম বলেন, অটোরিকশা বন্ধ করলে সাধারণ মানুষের যাতায়াতে বড় সংকট তৈরি হবে, কারণ অনেক মানুষের রুজি-রোজগার এর ওপর নির্ভরশীল। তার মতে, ইজিবাইকগুলোর পাশাপাশি ফুটপাত দখল ও রাস্তার ধারের অবৈধ বাজারগুলোও যানজটের জন্য সমানভাবে দায়ী।
সাতপাই কলেজ রোড এলাকার বাসিন্দা রাকিবুল ইসলামের পর্যবেক্ষণ হলো, অটোরিকশা চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ নেই এবং তারা যেখানে-সেখানে গাড়ি থামিয়ে রাখে। এ অবস্থায় প্রশাসনিক তদারকি ছাড়া শহরে স্বাভাবিক চলাচল বজায় রাখা দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। ইজিবাইকগুলো যেখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে।
জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান জানিয়েছেন, যানজট নিরসনে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণ, নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড নির্ধারণ এবং সড়ক দখলমুক্ত করার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সুর নেত্রকোনা পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নুরুল আমিনের কণ্ঠে। তিনি জানান, শহরে নিবন্ধনহীন এবং বাইরের ইজিবাইকের প্রবেশ ঠেকাতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অতীতেও এমন উদ্যোগ নেওয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদী সুফল মিলছিল না, এবার কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় নগরবাসী।
Leave a Reply