শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৫৮ অপরাহ্ন

হামের প্রকোপে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ, শিশুদের সুরক্ষায় বড় চ্যালেঞ্জ

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১৬ সময় দেখুন

দীর্ঘদিন হাম নিয়ন্ত্রণে রেখে বাংলাদেশ এক সময় সাফল্যের উদাহরণ তৈরি করেছিল। কিন্তু ২০২৫ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অস্থিরতার ফলে এই জনস্বাস্থ্য অর্জনে বড় ধরণের ধাক্কা লাগে। এর প্রভাবে টিকাদান কর্মসূচিতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তার মাসুল দিচ্ছে দেশের শিশুরা। দুর্বল তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং মাঠপর্যায়ে প্রচারের ঘাটতি এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ এই লক্ষ্যমাত্রার খুব কাছাকাছি থাকলেও ২০২৫ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অস্থিরতার জেরে সেই টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়। সংক্রামক এই রোগটিকে ভ্যাকসিন দিয়ে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলো অনেক বছর। ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাবের বিরুদ্ধে লড়াই করছে দেশের শিশুরা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ই মার্চ থেকে ৯ই অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ২ লাখ ২ হাজার সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২২ হাজার রোগীর সংক্রমণ নিশ্চিত করা হয়েছে। এ বছর বিশ্বে সন্দেহভাজন হামের রোগীর সংখ্যায় এটিই সর্বোচ্চ। প্রাণঘাতী এই রোগে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ১৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার ৯৪ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, যে কোনো দেশে মহামারি রোধে অন্তত ৯৫ শতাংশ টিকাদান কভারেজ নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেকোনো দেশে মহামারি ঠেকাতে অন্তত ৯৫ ভাগ টিকাদান কভারেজ প্রয়োজন।

২০২৫ সালে বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের ছন্দপতন ঘটে। ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ডোজের কভারেজ ৯০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের কভারেজ ৮৬ শতাংশে নেমে আসে। টিকাদান কর্মীদের কর্মবিরতি, টিকা আমদানিতে বিলম্ব এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে তদারকির অভাবে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল পাবলিক হেলথ স্কুলের অধ্যাপক এবং ডব্লিউএইচওর টিকা উপদেষ্টা মার্ক জিৎ একে বিশ্বের জন্য একটি চরম সতর্কবার্তা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি নিয়মিত টিকাদানের গুরুত্ব তুলে ধরে জানান, মহামারি মোকাবিলার চেয়ে রোগ প্রতিরোধের এই প্রক্রিয়া অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও নিরাপদ। বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদানের হার কমে গেলে কী ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে, বিশ্ববাসীর জন্য বাংলাদেশ এখন সেই বাস্তব সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে।

সরকারি টিকাদান কার্যক্রমে প্রস্তুতির ঘাটতি ও তথ্যের গড়মিল ছিল স্পষ্ট। এপ্রিলে প্রায় ২ কোটি শিশুকে টিকা দেয়ার দাবি করা হলেও জুনের স্বাস্থ্য জরিপে দেখা যায়, সমবয়সী আরও ৪০ লাখ শিশু তালিকার বাইরে থেকে গেছে। এছাড়া প্রস্তুতির ধাপগুলো কমিয়ে একটি ধাপে টিকাদান সম্পন্ন করায় কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি। পরিসংখ্যান বলছে, ক্যাম্পেইনের আগে আক্রান্ত শিশুদের ৮২ শতাংশ ছিল টিকাহীন, যা ক্যাম্পেইনের পরেও ৮৫ শতাংশে অপরিবর্তিত থাকে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার সেপ্টেম্বরে জানিয়েছিলেন, সরকার প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সব ধরনের চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে অভিভাবকদের অনীহা বা অসুস্থতার কারণে কিছু শিশু টিকা থেকে বাদ পড়তে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ভুল তথ্য ও প্রস্তুতির ঘাটতি রয়টার্সের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সরকারের জরুরি টিকাদান কার্যক্রমে মারাত্মক ত্রুটি ছিল।

হামের প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সিলেট অঞ্চল। সরকারি হিসাবেই সেখানে ১৮০ শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, সময়মতো গ্রামে স্বাস্থ্যকর্মীদের দেখা পাওয়া যায়নি। সিলেটে বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ১৯৮ জন নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে। এছাড়া ডেঙ্গুর প্রকোপের কারণে সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীদের প্রবল চাপ তৈরি হয়েছে। সিলেটের ১০০ শয্যাবিশিষ্ট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগী ভর্তি রয়েছে। চিকিৎসকরা পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুদেরও টিকার আওতায় আনার সুপারিশ করেছেন, কারণ বর্তমান আক্রান্তের এক-তৃতীয়াংশই এই বয়সসীমার। একইসঙ্গে কেন শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্রুত কমে যাচ্ছে, তা নিয়ে চলমান গবেষণাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। সেসময় যাদের হামের টিকা দেয়া হয়নি বড় মূল্য চোকাতে হচ্ছে তাদের।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর