কক্সবাজারের মেয়ে ফাতেমা আক্তার জাপানে অনুষ্ঠিত ২০তম এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের প্রথম নারী সার্ফার হিসেবে অংশ নিয়ে ইতিহাস গড়েছেন। তবে বিশ্বমঞ্চে পদার্পণের এই পথচলা মোটেও মসৃণ ছিল না। তাঁকে দীর্ঘ সময় সামাজিক রক্ষণশীলতা, কটূক্তি, হয়রানি এবং তীব্র আর্থিক সংকটের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে। ১৯ অক্টোবর আব্দুল কুদ্দুসের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় তিনি তাঁর সার্ফার হয়ে ওঠার পেছনের অদম্য সাহসের গল্প শুনিয়েছেন। ১৯ অক্টোবর কক্সবাজারে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক আব্দুল কুদ্দুস। অর্থের অভাব কি কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
মহেশখালীর দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া ফাতেমা ছোটবেলায় বাবাকে হারান। জীবিকার তাগিদে মায়ের সঙ্গে কক্সবাজার শহরে চলে আসার পর সৈকতে শামুক-ঝিনুক কুড়িয়ে সেগুলো দিয়ে মালা তৈরি করে পর্যটকদের কাছে বিক্রি করাই ছিল তাঁদের সংসার চালানোর একমাত্র পথ। তিনি জানান, সার্ফিং শুরু করার আগে বড় কোনো স্বপ্ন দেখার সাহস ছিল না। তবে কোচ রাশেদ আলমের কাছে সার্ফিংয়ের প্রশিক্ষণ শুরু করার পরই তিনি জীবনের নতুন মানে খুঁজে পান। মহেশখালীতে বেড়ে ওঠা, বাবাকে হারানো, তারপর জীবনের সংগ্রামের কথা শুনতে চাই। আমার কোচ রাশেদ আলম ভাই আমাকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন। একদিন বান্ধবীদের সঙ্গে সৈকতে এসে দেখি, কয়েকটি মেয়ে সার্ফিং করছে। বান্ধবীকে বললাম, ‘তোরা সার্ফিং কর, আমার পক্ষে সম্ভব না। বান্ধবী সাহস দিয়ে বলল, ‘আমি পারলে তুই কেন পারবি না। এমনও হয়েছে, বাসার কাউকে কিছু না জানিয়েই খুব সকালে সার্ফিং করতে চলে গেছি। আমি কান্নাকাটি করে আম্মুকে বলতাম, মানুষের কথায় কী আসে যায়। মাকে বোঝালেন, সার্ফিং খারাপ কিছু নয়। সমাজের লোক কত কিছু বলবে, তাতে কান দিলে চলবে না। সার্ফিং শিখতে গিয়ে সাগরে ডুবে গেলে আমি কাকে নিয়ে বাঁচব। সার্ফিংটা ধরে রাখ, ক্যারিয়ার তৈরি কর।’। কিন্তু পরিবার বা সমাজের বাধায় কত মেয়ের স্বপ্ন যে শেষ হয়ে যাচ্ছে।
প্রথমবার সমুদ্রে নামার অভিজ্ঞতা ছিল বেশ কঠিন। প্রথম দিনই বোর্ড থেকে পড়ে গিয়ে ব্যথা পান এবং ঢেউয়ের তোড়ে ছিটকে গিয়ে হাল ছেড়ে দেওয়ার উপক্রম হয়েছিল। কিন্তু বান্ধবীর উৎসাহে তিনি আবারও বোর্ডে ওঠেন। সেইবার ঢেউয়ের ওপর সঠিকভাবে ভারসাম্য বজায় রেখে দাঁড়িয়ে পড়ার অনুভূতি বর্ণনা করতে গিয়ে ফাতেমা বলেন, ‘মনে হয়েছিল আমি যেন আকাশে উড়ছি।’ সেই প্রথম জয়ের আনন্দ তাঁকে সার্ফিংয়ের প্রেমে ফেলে দেয়, যা পরবর্তীতে তাঁর নিত্যদিনের নেশায় পরিণত হয়। ভোর হওয়ার অপেক্ষায় বিনিদ্র রাত কাটাতে শুরু করেন তিনি। কখন সকাল হবে, কখন আবার সমুদ্রে নামব, সেই অপেক্ষায় অনেক রাত ঘুমাতে পারিনি।
সামাজিক প্রতিকূলতা ছিল তাঁর সার্ফিংয়ের বড় অন্তরায়। ছোট পোশাক পরা, কালো হয়ে যাওয়া কিংবা বিয়ের চিন্তা—এসব নিয়ে মানুষ নানা নেতিবাচক কথা ছড়াত। এমনকি মায়ের কাছে গিয়েও নালিশ জানানো হতো, যার ফলে এক পর্যায়ে দুই সপ্তাহ তাঁর অনুশীলন বন্ধ ছিল। কিন্তু কোচ রাশেদ আলম তাঁর মায়ের সঙ্গে দেখা করে সার্ফিংয়ের মাহাত্ম্য বুঝিয়ে পুনরায় প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করে দেন। পথঘাটে বখাটেদের উত্ত্যক্তের শিকার হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে, তবুও তিনি দমে যাননি।
ফাতেমা জানান, মা শুরুতে খুবই চিন্তিত ছিলেন, কারণ পরিবারের প্রধান হিসেবে বাবাকে হারিয়ে মা তাঁকে নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগতেন। তবে এ বছরের এপ্রিলে লাবণী পয়েন্টে আয়োজিত জাতীয় সার্ফিং প্রতিযোগিতায় ২৩ জন প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর মায়ের মানসিকতায় বড় পরিবর্তন আসে। এখন মা নিজেই তাঁকে সার্ফিং চালিয়ে যেতে এবং নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে উৎসাহ দেন। তিনিই বুঝিয়েছেন, স্বপ্ন থাকলে মানুষ অনেক দূর যেতে পারে। সেদিন ২৩ জন প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলেছিলাম। পরিবারের উচিত সন্তান কী চায়, সেটাও বোঝার চেষ্টা করা।
একসময় ১২ জন মেয়ে একসঙ্গে প্রশিক্ষণ নিলেও এখন মাত্র তিনজন বাকি আছেন। অনেকেরই বিয়ে হয়ে গেছে বা পরিবারের চাপে সার্ফিং ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। ফাতেমার ভাষ্যমতে, বিয়ে করলে হয়তো তাঁর অবস্থাও একই হতো, কিন্তু তিনি সার্ফিং ধরে রেখে পড়াশোনা ও ক্যারিয়ারের পথ বেছে নিয়েছেন। বর্তমানে তিনি দশম শ্রেণিতে পড়ছেন এবং স্কুল, সংসারের কাজ ও নিয়মিত সার্ফিংয়ের ভারসাম্য বজায় রেখে চলছেন। এমন একটি পরিবারের মেয়ে সার্ফিং করবে, তা ভাবতেই অবাক লাগে। আগে শুধু পড়াশোনা করতাম, বাসায় থাকতাম।
আর্থিক সংকট সব সময়ই ছিল তাঁর সঙ্গী।
কোচ রাশেদ আলম কেবল সার্ফিং নয়, তাঁর স্কুলের খরচ ও যাতায়াতের দায়িত্ব নিয়েও পাশে দাঁড়িয়েছেন।
এশিয়ান গেমসে জাপানে যাওয়ার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ফাতেমা জানান, সেখানে কোচ ছাড়া একা সবকিছু সামলাতে গিয়ে কিছুটা ঘাবড়ে গেলেও তিনি দ্বিতীয় রাউন্ড পর্যন্ত লড়েছেন। সামনে এসএসসি পরীক্ষা, তাই পড়াশোনার চাপ কিছুটা বেড়েছে।
উন্নত দেশের সার্ফারদের সরকারি-বেসরকারি সহায়তা এবং উন্নত সরঞ্জাম থাকলেও তাঁর ছিল মাত্র একটি বোর্ড। তিনি মনে করেন, ক্যালিফোর্নিয়া, বালি বা গোয়ার মতো স্থানে প্রশিক্ষণের সুযোগ পেলে বাংলাদেশের সার্ফাররা আরও ভালো করত।
আগামী পাঁচ বছরে অলিম্পিকে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিশ্বের সেরা সার্ফারদের সঙ্গে লড়াই করার স্বপ্ন দেখেন তিনি। এছাড়া দেশের মেয়েদের জন্য একটি সার্ফিং স্কুল বা ক্লাব গড়ে তোলার পরিকল্পনাও আছে তাঁর, যেখানে মেয়েরা স্বাধীনভাবে নারী কোচের তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ নিতে পারবে। তবে এর জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং নিরাপদ পরিবেশের প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
ভবিষ্যতে সার্ফিং শিখতে চাওয়া নতুনদের উদ্দেশ্যে ফাতেমা বলেন, ‘সাহস হারিও না, মনোবল শক্ত রাখো।’ ছোটবেলার নিজেকে তিনি বলতে চান যে, ভয় পেয়ে বসে থাকলে জীবন শুধু রান্নাবান্না ও সংসারেই সীমাবদ্ধ থাকত। নিজের স্বপ্নকে গুরুত্ব দিয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়াই সাফল্যের চাবিকাঠি। আগামী ৫ বা ১০ বছরে নিজেকে কোথায় দেখতে চান। দেখি, সে ঘরে রান্নাবান্না আর সন্তান নিয়ে ব্যস্ত।