ঢাকা, ০৭ নভেম্বর ২০২৬ইং (ঢাকা টিভি রিপোর্ট): উন্নয়ন ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এবার সরকারি কর্মকর্তাদের পাকিস্তান পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই প্রক্রিয়ার আওতায় অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার ৫ জন এবং যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার ৩০ জনসহ মোট ৩৫ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রশিক্ষণের জন্য লাহোর সফর করবেন। আগামী ৯ নভেম্বর থেকে শুরু হয়ে এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চলবে ২২ নভেম্বর পর্যন্ত। গত বুধবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে একটি সরকারি আদেশ (জিও) জারি করেছে।
লাহোরের ন্যাশনাল স্কুল অব পাবলিক পলিসিতে আয়োজিত এই প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চারজন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের দুজন এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দুজন প্রতিনিধি। বাকিরা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। ৮ নভেম্বর তাদের ঢাকা ত্যাগ করার কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের চিঠি অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে কর্মকর্তাদের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে। পাকিস্তানের লাহোরে ন্যাশনাল স্কুল অব পাবলিক পলিসিতে ১৪ দিনের এই প্রশিক্ষণ শুরু হবে ৯ নভেম্বর।
প্রশিক্ষণার্থীদের যাতায়াত, আবাসন ও আহারসহ যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করবে পাকিস্তান সরকার, অর্থাৎ এ সফরে বাংলাদেশ সরকারের ওপর কোনো আর্থিক দায় নেই। নিয়ম অনুযায়ী, প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফেরার পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে প্রত্যেক কর্মকর্তাকে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। তালিকায় থাকা অতিরিক্ত সচিব মোস্তফা জামান জানান, পাকিস্তানের প্রশাসনিক কাঠামো, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, সুশাসন, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি নীতি প্রণয়ন কৌশল সম্পর্কে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। সরকারের কাজে কারা অসহযোগিতা করছেন, শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে বলল সংসদীয় কমিটি।
এর আগে চলতি বছরের মে মাসে প্রথম দফায় ১২ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা পাকিস্তানের সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে (সিএসএ) প্রশিক্ষণ নিতে গিয়েছিলেন। ওই দলে একজন অতিরিক্ত সচিব ও ১১ জন যুগ্ম সচিব ছিলেন। মে মাসের ৪ তারিখ শুরু হওয়া সেই প্রশিক্ষণ ২১ মে শেষ হয়। সরকারি কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, পাকিস্তান ও ভারত উভয় দেশের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। তাঁদের মতে, বিদেশে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বাড়ে, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হয় এবং নেতৃত্বের বিকাশ ঘটে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দীর্ঘ সময় ধরে ভারতের মুসৌরিতে অবস্থিত লাল বাহাদুর শাস্ত্রী রাষ্ট্রীয় প্রশাসন একাডেমি ছিল বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের মূল কেন্দ্র। ২০১৪ সালে এনসিজিজির সঙ্গে সমঝোতা চুক্তির পর ২০১৯ ও ২০২৪ সালে তা নবায়ন করা হয়। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ঢাকা-দিল্লি কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন ও ভিসা জটিলতার কারণে সেই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এখন স্থবির। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১৪ সালে দিল্লিভিত্তিক ন্যাশনাল সেন্টার ফর গুড গভর্ন্যান্সের (এনসিজিজি) সঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সমঝোতা স্মারক সইয়ের মধ্য দিয়ে এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়। তৃতীয় দফায় ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল ঢাকায় দুই পক্ষের মধ্যে চুক্তি হয়। সর্বশেষ চুক্তিটির মেয়াদ ছিল এক বছর। ২০৩০ সাল পর্যন্ত চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছিল।
কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক সূত্রগুলো বলছে, পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে প্রশিক্ষণের প্রস্তাব এলেও বিগত সরকারের আমলে তাতে সাড়া দেওয়া হয়নি। তবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি পাকিস্তান সফর করলে বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে। পরবর্তীতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পর পাকিস্তানের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণের প্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বর্তমানে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি নেই। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও প্রশাসনিক জানাশোনা তৈরির লক্ষ্যেই এখন কর্মকর্তাদের পাঠানো হচ্ছে, পরবর্তীতে চুক্তির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বিশ্লেষকদের মতে, নির্দিষ্ট কোনো দেশের ওপর নির্ভর না করে একাধিক দেশের সঙ্গে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের এই উদ্যোগ ইতিবাচক।