টেকনাফ (কক্সবাজার), ০৬ নভেম্বর ২০২৬ইং (ঢাকা টিভি রিপোর্ট): কক্সবাজারের টেকনাফের হ্নীলা রঙ্গীখালীর দুর্গম পাহাড় এলাকায় সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের একটি আস্তানায় অভিযান চালিয়ে ৫৬ জন ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করা হয়েছে। দীর্ঘ আট দিন গহীন অরণ্যে বন্দি থাকার পর শুক্রবার সকালে তাদের টেকনাফ মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়। এই উদ্ধার অভিযানটি সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনীর একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার বিকেলে হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গীখালীর দুর্গম পাহাড়ে মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে যৌথবাহিনীর অভিযানে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। যৌথ অভিযানে সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন (রামু ক্যান্টনমেন্ট), বিজিবি ও পুলিশ অংশ নেয়।

অভিযান চলাকালীন পাচারকারীদের গুলিতে সেনাসদস্য মো. তিতাস শেখ (২৭) নিহত হন।

এছাড়া চক্রের পাঁচ সদস্যকে আটক করা হয়েছে এবং তাদের কাছ থেকে একটি পিস্তল, একটি দেশীয় তৈরি বন্দুক ও চার রাউন্ড গুলি জব্দ করা হয়েছে।

এই ঘটনার পর পুরো এলাকায় স্থানীয়দের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।

মানব পাচারকারীদের আস্তানা নির্মূলে সাঁড়াশি অভিযানের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিরা। শুক্রবার জুমার নামাজের পর টেকনাফের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।

থানা হেফাজতে থাকা ফরিদপুরের আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, আট দিন ধরে তাকে পাহাড়ের একটি ঝুপড়ি ঘরে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। কুতুপালং ক্যাম্পের ইমামুল নামের এক রোহিঙ্গার মাধ্যমে চাকরির প্রলোভনে পড়ে তিনি এই চক্রের খপ্পরে পড়েন। আসাদুজ্জামান বলেন, ‘দুইবার পালানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি। সেখানে ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি সশস্ত্র পাহারাদল সার্বক্ষণিক নজরদারি করত।’ একপর্যায়ে ক্যাম্পে কাজ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে আট দিন আগে তাকে ডেকে নেওয়া হয়।

উদ্ধার হওয়া উখিয়ার সেপটখালীর বাসিন্দা মো. সাইফুল ও মিজানুর রহমান সাগর জানান, নুর আলী নামের এক দালালের মাধ্যমে তাদের সেখানে নেওয়া হয়। পরে জানতে পারেন, পাচারকারীরা তাদের জনপ্রতি এক লাখ টাকায় কিনেছে। প্রতিদিন নতুন করে ৪-৫ জন মানুষকে সেখানে জড়ো করা হতো এবং কারো প্রতিবাদ করার সুযোগ ছিল না। তারা লোহার শিকলে বন্দি অবস্থায় অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আবার কাউকে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে লাখ টাকায়।

আসামি আসাদুজ্জামানের ভাষ্যমতে, ঘটনার দুদিন আগেই শতাধিক নৌকাসহ একটি ট্রলার সাগরপথে যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু ট্রলারে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় অনেককে সে যাত্রায় নেওয়া সম্ভব হয়নি। এটি ছিল মানব পাচারকারীদের বড় একটি নীল নকশা।

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানান, উদ্ধার হওয়া ৫৬ জনের পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। একইসঙ্গে সেনাসদস্যের নিহতের ঘটনায় আইনানুগ প্রক্রিয়া চলছে। অন্যদিকে, টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম অনীক চৌধুরী বলেছেন, সশস্ত্র পাচারকারীদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বশক্তি দিয়ে মাঠে কাজ করছে। অপরাধী যেই হোক, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন। উদ্ধার হওয়া জিম্মিদের কাছ থেকে চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে।