যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সিনেট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদকে লক্ষ্য করে ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য ও বিদ্বেষমূলক প্রচারণা নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই বৈরী পরিবেশে স্থানীয় মুসলিম ও আরব-আমেরিকান সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হলেও তারা নিজেদের রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার রক্ষার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ থাকার ঘোষণা দিয়েছেন।
নির্বাচনি প্রচারণার অংশ হিসেবে ডেট্রয়েটে আয়োজিত বারাক ওবামার একটি সমাবেশের বাইরে জেক ল্যাং নামক এক ডানপন্থি উসকানিদাতা বুলহর্নের মাধ্যমে প্রকাশ্যে মুসলিমবিরোধী স্লোগান দেন। এ সময় তার সহযোগীদের হাতে রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী মাইক রজার্সের প্রচারপত্র ও ক্রুসেডের প্রতীকসংবলিত সামগ্রী দেখা যায়। ল্যাং সরাসরি মুসলমানদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের হুমকিও প্রদান করেন।
আরব ও মুসলিম অধিকারকর্মী সুহাইলা আমেন এই পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করে জানান, বর্তমানে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, তা ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পরবর্তী সময়ের চেয়েও ভয়াবহ। ডেট্রয়েটের উপশহর ডিয়ারবর্নের মেয়র আবদুল্লাহ হামুদ জানান, তার শহরে প্রতিদিন ফোনকল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং জরুরি নম্বরের মাধ্যমে হুমকি আসছে। তবে এসব হুমকি সত্ত্বেও মুসলমানরা ভীত না হয়ে বরং অধিকতর রাজনৈতিক সচেতন হয়ে উঠছেন। মেয়রের মতে, এই বিদ্বেষের উপযুক্ত জবাব হবে আল-সাইয়েদকে সিনেটে বিজয়ী করা। তার ভাষায়, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পরবর্তী সময়ও বর্তমান পরিস্থিতির তুলনায় অনেক সহজ ছিল।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিয়মিত আল-সাইয়েদের নাম বিকৃত করে তাকে ‘জিহাদি’ বলে আখ্যায়িত করছেন। রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স কোনো ধরনের তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই আল-সাইয়েদের বিরুদ্ধে হামাস, হিজবুল্লাহ, মুসলিম ব্রাদারহুড ও ইরানের সঙ্গে গোপন সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলেছেন। অন্যদিকে, ট্রাম্পের স্বাস্থ্যবিষয়ক মন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র আরবদের বিজ্ঞান ও সাহিত্যের অবদান নিয়ে অপমানজনক মন্তব্য করেছেন এবং সিনেটর টেড ক্রুজ আল-সাইয়েদকে ‘জিহাদি লেপ্রেচন’ বলে অভিহিত করেছেন।
অভিযোগের জবাবে আবদুল আল-সাইয়েদ জানান, এসব ভিত্তিহীন দাবি মূলত জনদৃষ্টিকে আসল সমস্যা থেকে সরানোর একটি কৌশল। মিশিগানে জন্মগ্রহণকারী এই চিকিৎসক জনস্বাস্থ্যে ডক্টরেটধারী এবং একজন স্বচ্ছ ভাবমূর্তির অধিকারী। তিনি এসব অপপ্রচারের নিন্দা জানিয়ে বলেন, এটি নিছক রাজনৈতিক মনোযোগ নষ্ট করার অপচেষ্টা। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির এক জনমত জরিপ অনুযায়ী, ৩৮ শতাংশ ভোটার মুসলিম প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করেছেন। মাইক রজার্সের নির্বাচনি সমাবেশে ট্রাম্প আল-সাইয়েদকে নিয়ে দীর্ঘ আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন, যেখানে উপস্থিত সমর্থকরা তাকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে স্লোগান দেয়। ৯/১১ হামলায় সন্তান হারানো ডেভিড বিমারও আল-সাইয়েদের মার্কিন পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলে দাবি করেন যে, জন্মসনদ থাকলেই কেউ প্রকৃত আমেরিকান হতে পারে না। মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির সম্ভাব্য ভোটারদের ওপর পরিচালিত এক জরিপে ৩৮ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, কোনো প্রার্থী মুসলিম হলে তাকে ভোট দেওয়ার আগ্রহ কমতে পারে।
আমেরিকান মুসলিমস ফর প্যালেস্টাইনের পরিচালক আবদেলহালিম আবদেলরহমান বিষয়টিকে সরাসরি ইসলামবিদ্বেষ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তার ভাষ্যমতে, আল-সাইয়েদের ধর্ম পরিচয় ও নামকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সন্দেহের তালিকায় আনা হচ্ছে। অধিকারকর্মীদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন জ্বালানি সংকট, ইরান যুদ্ধ ও নিজস্ব ব্যর্থতা থেকে নজর ঘোরাতেই মুসলিম সম্প্রদায়কে বলির পাঁঠা বানাচ্ছে। মুসলিম অধিকারকর্মীদের মতে, রাজনৈতিক বিতর্কের আড়ালে আরব ও মুসলিম আমেরিকানদের বহিরাগত হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে।
সুহাইলা আমেন পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, যখন ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা বৈষম্যমূলক বক্তব্য দেন, তখন তা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিদ্বেষকে আরও উৎসাহিত করে।
তিনি স্পষ্ট করেন, ‘মানুষের পছন্দ হোক বা না হোক, আমরা এই দেশের সামাজিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ। অন্যদিকে, রিপাবলিকান সমর্থক ব্রায়ান প্যানেবেকার দাবি করেন, জ্বালানির দাম বাড়লেও কোনো ‘সমাজতান্ত্রিক ইসলামপন্থি’ প্রার্থীকে সমর্থন করা উচিত হবে না। এমন প্রতিকূল পরিবেশে মিশিগানের মুসলিম নেতারা ঐক্যবদ্ধ থেকে নাগরিক অধিকার চর্চার মধ্য দিয়েই বিদ্বেষের জবাব দেওয়ার সংকল্প ব্যক্ত করেছেন।