বিশ্বের অন্যতম প্রধান জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকারী দেশ বাংলাদেশ। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাম্প্রতিক কিছু নীতি ও পদক্ষেপ দেশের জাহাজভাঙা শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে সমুদ্রসৈকতে জাহাজ তুলে ভাঙার প্রচলিত ‘বিচিং’ পদ্ধতির ওপর ইউরোপীয় কমিশনের বর্তমান অবস্থান এ শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাহাজভাঙা শিল্প: গ্রিন ইয়ার্ডের সনদ মানেই শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা নয়।
২০২৬ সালের ২৩ জুলাই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে, যখন ইউরোপীয় জাহাজমালিকদের সংগঠনগুলো ভারতের আলাংয়ে বিচিং পদ্ধতিতে পরিচালিত দুটি জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ স্থাপনাকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনুমোদিত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব জানায়। এই উদ্যোগকে আন্তর্জাতিক শিপিং সংগঠন বিমকোও সমর্থন দিয়েছে। তাদের মতে, যেসব ভারতীয় ইয়ার্ড হংকং কনভেনশনের শর্তাবলি পূরণ করছে, বিচিং পদ্ধতি অবলম্বন করলেও তাদের অনুমোদন পাওয়া উচিত। এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতিমালা কীভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে এখন বড় ধরনের আলোচনা চলছে।
বিশ্বের বৃহৎ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান অন্যতম। স্বাভাবিকভাবেই ভারতের ইয়ার্ডগুলোর বিষয়ে ইউরোপীয় কমিশনের নেওয়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য একটি নজির হয়ে থাকবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘শিপ রিসাইক্লিং রেগুলেশন’ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোকে অনুমোদিত তালিকায় থাকা স্থাপনাতেই রিসাইক্লিং করতে হয়। কোনো বাংলাদেশি স্থাপনা এই তালিকায় জায়গা করে নিতে পারলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পতাকাবাহী জাহাজ গ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে, যা শিল্পের জন্য ইতিবাচক।
তবে বিষয়টি কেবল সুযোগের নয়, চ্যালেঞ্জেরও। ভারতের স্থাপনাগুলো অনুমোদন পেলে এবং বাংলাদেশের যোগ্য স্থাপনাগুলো তালিকার বাইরে থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়তে পারে। অবশ্য কোনো বিদেশি স্থাপনা অনুমোদিত হলেই বাংলাদেশের স্থাপনাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আইনি অধিকার পায় না। প্রতিটি আবেদনই সংশ্লিষ্ট বিধিমালার আলোকে নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। বাংলাদেশের প্রত্যাশা হওয়া উচিত যে, আবেদনকারী সব স্থাপনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছ, সামঞ্জস্যপূর্ণ ও প্রমাণভিত্তিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা হবে।
নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও পরিবেশের সুরক্ষা এ ক্ষেত্রে মূল বিবেচ্য বিষয়।
দক্ষিণ এশিয়ার অনেক স্থাপনায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও, বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এখনো ঘাটতি রয়েছে। জাহাজ থেকে নির্গত অ্যাসবেস্টস, ভারী ধাতু, দূষিত তেল ও বিষাক্ত রং কীভাবে অপসারিত হচ্ছে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে তা কোথায় নিষ্পত্তি করা হচ্ছে, তা নিবিড় তদারকি প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বাসেল কনভেনশনের ৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিপজ্জনক বর্জ্যের পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনার বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। যদিও জাহাজ কোনো স্থাপনায় পৌঁছালেই কনভেনশন লঙ্ঘিত হলো—এমন উপসংহার টানা ঠিক নয়, তবে ইয়ার্ডের অনুমোদন থাকলেই সব নিয়ম মানা হয়েছে, এমন ধারণাও সঠিক নয়। বিশেষত রপ্তানিকারক রাষ্ট্রের কাছে যদি বিশ্বাস করার কারণ থাকে যে সংশ্লিষ্ট বর্জ্য পরিবেশসম্মতভাবে ব্যবস্থাপিত হবে না, তাহলে কনভেনশনের বিধান অনুযায়ী সেই রপ্তানি অনুমোদনের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হতে পারে। তবে বাসেল কনভেনশন নিজে শ্রমিকদের চিকিৎসা, ক্ষতিপূরণ কিংবা বিচারিক প্রতিকারের বিস্তারিত বিধান নির্ধারণ করে না।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের শিপ রিসাইক্লিং রেগুলেশনের ১৩ ও ১৫ অনুচ্ছেদে অবকাঠামো, নিরাপত্তা, দূষণ প্রতিরোধ ও বিপজ্জনক উপাদান নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে কঠোর শর্ত রয়েছে। হংকং কনভেনশনের শর্ত পূরণ করলেই ইউরোপীয় তালিকায় ঠাঁই পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই; বরং স্থাপনাগুলোকে ইউরোপীয় বিধিমালার প্রযোজ্য শর্তও যথাযথভাবে পূরণ করতে হবে। বিচিং পদ্ধতিতে জোয়ার-ভাটাপ্রবণ উপকূলে কাজ করার সময় বিষাক্ত উপাদান পরিবেশের মিশে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়, যা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে।
সীতাকুণ্ডের এই শিল্পের অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম হলেও উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকে উপেক্ষা করা যাবে না। শ্রমিকদের নিরাপত্তা, সুরক্ষাসামগ্রী এবং পেশাগত স্বাস্থ্যঝুঁকি নিরসনে জাতীয় শ্রম আইন ও আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতাগুলো কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে। ড. ইশতিয়াক আহমেদ মনে করেন, ভারতের এই প্রস্তাব বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে সতর্কতা ও সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে এসেছে। সরকারের উচিত ইউরোপীয় কমিশনের সিদ্ধান্ত ও মানদণ্ড গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং দেশের যোগ্য ইয়ার্ডগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে উদ্যোগী হওয়া, যাতে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি হয়। ড. ইশতিয়াক আহমেদ অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, আইন বিভাগ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি।