ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক, ২৮ অক্টোবর ২০২৬ইং (ঢাকা টিভি রিপোর্ট): মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গে অপরাধ দমনে উত্তরপ্রদেশ বা আসামের ‘এনকাউন্টার’ মডেল অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মঙ্গলবার উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটা এবং মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানে একই দিনে পুলিশের গুলিতে দুই অভিযুক্তের মৃত্যুর পর এই প্রশ্ন জোরালো হয়ে উঠেছে। অপরাধ দমনের নামে এই ঘটনাগুলো নিছক পুলিশের আত্মরক্ষা, নাকি বিচারব্যবস্থাকে এড়িয়ে অভিযুক্তকে শেষ করার সাজানো চিত্রনাট্য, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অনেকে। বিশেষ করে ধুলিয়ানে এক সংখ্যালঘু যুবকের মৃত্যুর পর পুলিশি অভিযানের স্বচ্ছতা নিয়ে স্থানীয়রা প্রশ্ন তুলেছেন। সামাউল ও তাজকিরা স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ধুলিয়ানে একটি ভাড়াবাড়িতে থাকতেন।

গাইঘাটা এবং ধুলিয়ানের দুটি ঘটনাই প্রায় একই রকম। উভয় ক্ষেত্রেই পুলিশ হেফাজতে থাকা অভিযুক্তকে ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য নির্জন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, অভিযুক্তরা পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র কেড়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন এবং ঠিক তিন রাউন্ড করে গুলি চালান। এরপর পুলিশ আত্মরক্ষার যুক্তিতে পাল্টা গুলি চালালে দুজনেই মারা যান। এই ঘটনার সাথে তিন মাস আগের বারুইপুরের এক অভিযুক্তের মৃত্যুর ঘটনার মিল খুঁজে পাচ্ছেন পর্যবেক্ষকরা। যদিও পুলিশের ভাষ্যমতে, বারুইপুরের ঘটনায় অভিযুক্ত মাত্র এক রাউন্ড গুলি করার সুযোগ পেয়েছিলেন। সাড়ে তিন মাস আগে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে ১১ বছরের এক নাবালিকাকে ধর্ষণ ও খুনে অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলের এনকাউন্টারের সঙ্গেও এই জোড়া ঘটনার অদ্ভুত মিল পাচ্ছেন অনেকে। দুটি ঘটনাই যেন একে অপরের হুবহু ‘রি-মেক’।

মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানের ঘটনাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। গত ২৮ আগস্ট সামশেরগঞ্জের বাসিন্দা ব্যবসায়ী সুজিত মণ্ডল নিখোঁজ হওয়ার পর তার খণ্ডবিখণ্ড মৃতদেহ উদ্ধার হয়। এই খুনের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত সামাউল শেখকে নিয়ে গত মঙ্গলবার দুপুরে সিআইডি ঘটনার পুনর্নির্মাণে যায়। পুলিশের দাবি, সেখানে সামাউল পুলিশের রিভলভার কেড়ে তিন রাউন্ড গুলি চালান এবং পরে ডিএসপি-কে লক্ষ্য করলে পুলিশ পাল্টা গুলি চালায়। তবে ঘটনাস্থলের কাছে ভুটু মার্কেটের স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ভরদুপুরে ঘটনা ঘটলেও তারা কোনো গুলির শব্দ পাননি। উল্লেখ্য, সুজিত খুনের পর পুলিশের গাফিলতির অভিযোগে ধুলিয়ান ও সামশেরগঞ্জের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে সাসপেন্ড করা হয়েছিল। এরপর তিনি রিভলভার উঁচিয়ে জেলা পুলিশের ডিএসপি-কে তাক করলে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বাঁচাতে এক ইনস্পেক্টর সামাউলের মাথায় সরাসরি গুলি করেন। সামাউলের ভাড়াবাড়ি থেকে মাত্র ১০০ মিটার দূরের অকুস্থল ভুটু মার্কেটের বাসিন্দার দাবি, ভরদুপুরে ঘটনাটি ঘটলেও তারা কোনো গুলির শব্দই শুনতে পাননি। মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে এরপর ধুলিয়ান টিওপি-র ইনচার্জ ও সামশেরগঞ্জ থানার সেকেন্ড অফিসারকে সাসপেন্ড করা হয় এবং জঙ্গিপুরের এসপি-সহ একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তাকে শাস্তির মুখে পড়তে হয়। তিনি কটাক্ষ করে বলেন, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের যদি নিজেদের কোমরে রিভলভার রাখার ট্রেনিং না থাকে, তবে তারা কেমন পুলিশ।

অন্যদিকে, গাইঘাটার ঘটনায় ১৭ বছরের এক কিশোরী হত্যার অভিযোগে আত্মীয় প্রহ্লাদ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ভোররাতে ঘটনার পুনর্নির্মাণ শেষে ফেরার পথে প্রহ্লাদ পুলিশের বন্দুক কেড়ে তিন রাউন্ড গুলি চালান। পুলিশ আত্মরক্ষায় চার রাউন্ড পাল্টা গুলি চালালে প্রহ্লাদ নিহত হন। তবে পরিবারের দাবি, পুলিশ গভীর রাতে তাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। জঙ্গিপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। গত শনিবার গাইঘাটা থানা এলাকার বাসিন্দা ১৭ বছরের এক কিশোরী রাতে জলসা দেখতে গিয়ে নিখোঁজ হয় এবং রোববার সকালে তার বিবস্ত্র, ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার হয়। এরপরই তিনি কর্তব্যরত এক পুলিশকর্মীর বন্দুক ছিনিয়ে তিন রাউন্ড গুলি চালান, যার একটি পুলিশের গাড়িতে লাগে এবং এক পুলিশকর্মী জখম হন।

সরকারের এই কঠোর অবস্থানের পক্ষে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিধানসভায় জানিয়েছেন, নারী নির্যাতন ও নেশামুক্তির বিষয়ে পুলিশ পরিস্থিতি বুঝে ‘অন স্পট’ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা পেয়েছে। পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষের মতে, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশকে কিছু কঠিন পদক্ষেপ নিতেই হয়। এছাড়া আরজি কর হাসপাতালের ঘটনায় নিহত চিকিৎসকের মা ও বিজেপি বিধায়ক রত্না দেবনাথ এই এনকাউন্টারকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন। তবে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য ‘এনকাউন্টার’ শব্দটি ব্যবহারে আপত্তি তুলে এটিকে পরিস্থিতির বাধ্যবাধকতা বলে দাবি করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অতীতে ধুলিয়ানে হরগোবিন্দ দাস এবং চন্দন দাস হত্যাকাণ্ডের তুলনা টেনে জানিয়েছিলেন, পশুর মাংস কাটার ছুরি দিয়ে সুজিতকে খুন করা হয়েছে। রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ যোগী আদিত্যনাথ বা হিমন্ত বিশ্বশর্মার সুরেই বলেছেন, মানুষের মনে ভরসা ফেরাতে পুলিশকে কিছু ‘অপ্রিয় কাজ’ করতে হবে। রাজ্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে অপরাধীদের মনে ভয় ধরানো জরুরি বলে তিনি মনে করেন। রাজ্যের পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালও বারুইপুর এনকাউন্টারের পর অপরাধীদের কড়া বার্তা দিয়েছিলেন। আরজি কর হাসপাতালে নিহত চিকিৎসকের মা তথা বর্তমান বিজেপি বিধায়ক রত্না দেবনাথ এই এনকাউন্টারকে একশ ভাগ সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, যারা মেয়েদের ভোগ্যপণ্য ভাবে তাদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই।

বিরোধী শিবির এই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির তীব্র সমালোচনা করেছে। কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী পুলিশের পেশাদারিত্ব ও বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তৃণমূল বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় মন্তব্য করেছেন যে, এনকাউন্টার করে কেবল প্রচার পাওয়া যায়, আইন নয়। এছাড়া সিপিএম নেতা মহম্মদ সেলিম একে সস্তা নাটক বলে অভিহিত করেছেন। মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর-এর নেতা রঞ্জিত শূরও হাত খোলা অবস্থায় পুনর্নির্মাণে নিয়ে যাওয়ার পুলিশি তত্ত্ব নিয়ে গভীর সন্দেহ পোষণ করেছেন। এই জোড়া মৃত্যুর ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক ও বিচারিক কাঠামোর ওপর বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম এই ঘটনাগুলিকে সস্তা ‘সোপ অপেরা এপিসোড’ বলে তোপ দেগেছেন, যা দিয়ে আদতে অপরাধ কমানো সম্ভব নয়।