জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কূটনীতিক লানা নুসায়বেহর প্রার্থিতাকে সমর্থন জানানোর বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে যুক্তরাজ্য। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে যুক্তরাজ্যের এই অবস্থান বিশ্বরাজনীতিতে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ব্রিটিশ সরকারের ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্রের বরাতে এই তথ্য জানা গেছে, যদিও এখনো চূড়ান্ত কোনো ঘোষণা আসেনি।

মহাসচিব পদের দৌড়ে নুসায়বেহর অন্তর্ভুক্তি এমন এক সময়ে ঘটেছে যখন সুদানের গৃহযুদ্ধ নিয়ে আরব আমিরাতের ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্ক চলছে। বিভিন্ন রিপোর্টে অভিযোগ রয়েছে যে, আমিরাত আধা সামরিক বাহিনী ‘র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস’কে (আরএসএফ) সহায়তা দিচ্ছে। জাতিসংঘের তদন্তকারীদের মতে, এই বাহিনীর কর্মকাণ্ডে গণহত্যার সুস্পষ্ট লক্ষণ পাওয়া গেছে। অবশ্য সংযুক্ত আরব আমিরাত ও লানা নুসায়বেহ উভয়ই এসব অভিযোগ বারবার প্রত্যাখ্যান করে আসছেন। গত সপ্তাহে মহাসচিবের দৌড়ে নুসায়বেহর যোগ দেওয়ার আগে ছয়টি অনানুষ্ঠানিক ভোটাভুটি হয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েল যখন অবরুদ্ধ পশ্চিম তীরের কিছু অংশ সংযুক্ত করার কথা বিবেচনা করছিল, নুসায়বেহ তখন বলেছিলেন, আরব আমিরাত সব সময় এসব চুক্তিকে ফিলিস্তিনিদের সমর্থনের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখেছে। তিনি ইসরায়েল সরকারকে তাদের পরিকল্পনা স্থগিত করার আহ্বান জানান।

ইসরায়েলের সঙ্গে আরব আমিরাতের গভীর সম্পর্কের বিষয়টিও নুসায়বেহর প্রার্থনার ক্ষেত্রে বড় আলোচনার জায়গা তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাজ্যের এই সমর্থনের পেছনে ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কের সমীকরণ থাকতে পারে।

বিশেষ করে ম্যানচেস্টার সিটি ফুটবল ক্লাবকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক এবং ক্লাবের মালিক শেখ মনসুর বিন জায়েদ আল-নাহিয়ানের সঙ্গে আবুধাবির সম্পর্ক এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

ক্লাবটির বিরুদ্ধে ১১৪টি আর্থিক নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে আরব আমিরাতের কর্মকর্তারা যুক্তরাজ্যে বিনিয়োগ পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। বিগত মাসে এক তদন্তে উঠে এসেছে, ক্লাবটি ৮ কোটি ৩০ লাখ পাউন্ডের (১১ কোটি ডলার) বেশি অবৈধ অর্থায়নের তথ্য গোপন করে প্রিমিয়ার লিগের ১১৪টি আর্থিক নিয়ম ভঙ্গ করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘প্রিমিয়ার লিগের এসব পদক্ষেপের’ কারণে আরব আমিরাতের কর্মকর্তারা যুক্তরাজ্যে বিনিয়োগ বাতিল করার হুমকি দিয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে ‘যৌন সহিংসতাসহ অন্যান্য নৃশংসতার সঙ্গে জড়িত’ থাকার অভিযোগ রয়েছে।

এমন টানাপোড়েনের আবহে নুসায়বেহকে সমর্থন দেওয়ার মাধ্যমে আমিরাতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের একটি পথ খুঁজছে লন্ডন।

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্রের ভাষ্যমতে, তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার জন্য সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে জাতিসংঘের নেতৃত্বে নিয়ে আসা। কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীর বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য না করলেও, প্রার্থীদের যোগ্যতাকেই সবচেয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে ব্রিটিশ সরকার। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘যুক্তরাজ্যের প্রধান অগ্রাধিকার হলো এমন এক প্রার্থী খুঁজে বের করা, যিনি আমাদের বৈশ্বিক সংকটগুলো মোকাবিলায় জাতিসংঘকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত।’।

চলতি বছরের ডিসেম্বরে বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচটি স্থায়ী দেশ কোনো প্রার্থীর বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। লানা নুসায়বেহ নির্বাচিত হলে তিনি জাতিসংঘের ইতিহাসের প্রথম নারী মহাসচিব এবং মিসরের বুট্রোস বুট্রোস-ঘালির পর দ্বিতীয় আরব মহাসচিব হবেন। এসব ভোটাভুটির কোনোটিতেই জাতিসংঘের ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন পাঁচ স্থায়ী সদস্য (যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন ও ফ্রান্স) যৌথভাবে কোনো প্রার্থীর বিষয়ে একমত হতে পারেনি। নিরাপত্তা পরিষদকে ১৯৩ সদস্যের সাধারণ পরিষদের অনুমোদনের জন্য একজন প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করতে হবে। তবে তার আগেই পরিষদ কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এ সময়ে তিনি সাধারণ পরিষদের সহসভাপতি, ‘ইউএন উইমেন’ নির্বাহী বোর্ডের সভাপতি ও দুবার নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

৪৮ বছর বয়সী লানা নুসায়বেহ ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত। তাঁর দাদা আনোয়ার নুসায়বেহ ফিলিস্তিনের একজন খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ ছিলেন। লন্ডনের এসওএএস বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় তিনি জায়নবাদ ও ইসরায়েলের ইতিহাসের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ লিখেছিলেন। ২০২০ সালে এক কলামে ইমেরিটাস অধ্যাপক কলিন শিন্ডলার উল্লেখ করেছিলেন যে, নুসায়বেহ ইসরায়েলি গবেষণায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এবং আব্রাহাম চুক্তি স্বাক্ষরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৭৮ সালে জন্মগ্রহণকারী নুসায়বেহ ইউনেসকোর পরামর্শক ও গলফ রিসার্চ সেন্টারের গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন। নুসায়বেহ বংশসূত্রে ফিলিস্তিনি ও তাঁর পরিবার জেরুজালেমের বাসিন্দা। শিন্ডলার বলছেন, ২০২০ সালে ‘জুয়িশ ক্রনিকল’-এর একটি কলামে লিখেছিলেন, নুসায়বেহ ইসরায়েলি গবেষণায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেছিলেন।

২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘে আমিরাতের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা নুসায়বেহ সম্প্রতি তাঁর প্রচার শুরুর বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, বর্তমান সময়ের সংকট মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া এবং সব পক্ষকে এক ছাতার নিচে আনা জরুরি।

এদিকে, সুদানের পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাজ্য। তারা আরএসএফ ও সুদানিজ আর্মড ফোর্সেসের ১৫ জন জ্যেষ্ঠ কমান্ডারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড জানিয়েছেন, দারফুরে ধর্ষণ ও অনাহারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। এই প্রেক্ষাপটে কোনো যুদ্ধরত পক্ষকে সহায়তাকারী রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথা বলেছে যুক্তরাজ্য। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদনে আরএসএফ-কে আমিরাতের অস্ত্র সহায়তার প্রমাণ পাওয়ার দাবি করা হলেও আবুধাবি তা অস্বীকার করে আসছে। মিলিব্যান্ড বলেন, ‘এগুলো মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, অপরাধীদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।