বর্তমান পৃথিবী এক গভীর অস্থিরতার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির মাঠ এখন অবিশ্বাস, তীব্র সামরিক প্রতিযোগিতা, আঞ্চলিক সংঘাত ও অর্থনৈতিক চাপের মতো জটিল সমীকরণে আচ্ছন্ন। ভূরাজনৈতিক মেরুকরণ পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে। একদিকে ফ্রান্স ও ইউরোপীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ, অন্যদিকে সৌদি আরব ও উপসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলগত হিসাব-নিকাশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বিশ্বব্যবস্থাকে এক স্থায়ী অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। বৃহৎ শক্তিগুলোর পারস্পরিক রেষারেষি এই অস্থিরতাকে আরও উসকে দিচ্ছে। এক রাষ্ট্রের অস্ত্র বৃদ্ধি অন্য রাষ্ট্রের অস্ত্র বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করে; সামরিক জোটের সম্প্রসারণ প্রতিপক্ষের পাল্টা জোট গঠনের কারণ হয়; আর পারস্পরিক অবিশ্বাস কূটনৈতিক সমঝোতার পথ সংকুচিত করে। অন্যদিকে, উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত বা উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ, সামুদ্রিক পরিবহন, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুর্বল করে এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে অনিশ্চিত করে তোলে। অন্যদিকে, নির্মাণবাদ তুলে ধরে যে রাষ্ট্রগুলোর আচরণ শুধু বস্তুগত স্বার্থ দ্বারা নয়, ইতিহাস, পরিচয়, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং পরস্পর সম্পর্কে ধারণার দ্বারাও প্রভাবিত হয়। তবে এসব উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সমঝোতা বাস্তবায়নের ওপর। চতুর্থ ভিত্তি হবে আন্তর্জাতিক আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক দৃষ্টিতে আন্তর্জাতিক অস্থিরতার মূলে রয়েছে রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা ও ক্ষমতা অর্জনের নিরন্তর প্রতিযোগিতা।

আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় এমন কোনো একক সর্বজনীন কর্তৃপক্ষ বা সরকার নেই, যার আদেশ সব রাষ্ট্র মানতে বাধ্য।

ফলে প্রতিটি রাষ্ট্র নিজস্ব ভূখণ্ড, সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়।

যখন একটি রাষ্ট্র নিজের নিরাপত্তার প্রয়োজনে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে, তখন প্রতিবেশী বা প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র তাকে হুমকি হিসেবে গণ্য করে। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় ‘নিরাপত্তার দ্বিধা’ বা সিকিউরিটি ডিলেমা হিসেবে পরিচিত, যা নতুন নতুন সংঘাতের জন্ম দেয়।

এই অস্থিরতা এখন আর নির্দিষ্ট কোনো ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর। উদাহরণস্বরূপ, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের মাত্রা বাড়লে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তার ধাক্কা লাগে। একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে বিঘ্ন ঘটলে পণ্য পরিবহনের ব্যয় আকাশচুম্বী হয় এবং বিশ্বজুড়ে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়ে মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বিনিয়োগের ওপর, যা প্রতিটি দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকেও দুর্বল করে দেয়। জটিল অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতার তত্ত্ব ব্যাখ্যা করে, বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের সম্পর্ক রাষ্ট্রগুলোকে কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে। জ্বালানি, খাদ্য, ওষুধ এবং গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের বিকল্প উৎস, সরবরাহব্যবস্থার বৈচিত্র্য এবং সংকটকালীন অর্থায়নের ব্যবস্থা এ ক্ষেত্রে অপরিহার্য।

বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। এখানে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ে, যার ফলে জ্বালানির দাম বাড়ার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং জনজীবনে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়। আবার এই সংকটের সাথে যখন বৃহৎ শক্তিগুলোর স্বার্থ জড়িয়ে পড়ে, তখন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে যায়। যেকোনো এক পক্ষকে সামরিক বা কূটনৈতিক সমর্থন প্রদানের মাধ্যমে ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার পথ তৈরি হয়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যায় বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে।

বিশ্বব্যবস্থার এই জটিল সমস্যার সমাধানে কেবল সাময়িক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়। আমাদের প্রয়োজন একটি সমন্বিত বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা কাঠামো। বাস্তববাদ, উদার প্রাতিষ্ঠানিকতাবাদ, অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা ও নির্মাণবাদের মতো রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিভিন্ন তত্ত্বের আলোকে এই কাঠামো তৈরি করা সম্ভব। এটি রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতাকে বজায় রেখেও সেটিকে যুদ্ধ বা বিপর্যয়কর অর্থনৈতিক সংকট থেকে দূরে রাখার পথ দেখাতে পারে। মূলত এমন একটি পরিবেশ জরুরি যেখানে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যেন সহজেই যুদ্ধ, অর্থনৈতিক বিপর্যয় কিংবা দীর্ঘস্থায়ী বৈরিতায় রূপ নিতে না পারে। উদার প্রাতিষ্ঠানিকতাবাদ দেখায়, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও নিয়মের মাধ্যমে প্রতিযোগিতার মধ্যেও সহযোগিতা সম্ভব।

এই কাঠামোর প্রধান ভিত্তি হওয়া উচিত নিরাপত্তার ভারসাম্য রক্ষা ও ঝুঁকি হ্রাস করা। দ্বিতীয়ত, কার্যকর বহুপক্ষীয় কূটনীতি ও মধ্যস্থতার ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি, যাতে বিরোধ চূড়ান্ত পর্যায়ে যাওয়ার আগেই জাতিসংঘ বা আঞ্চলিক সংস্থার মাধ্যমে আলোচনার পথ খোলা থাকে। তৃতীয়ত, এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রয়োজন যা পারস্পরিক বাণিজ্য ও সহযোগিতার সুবিধা নিশ্চিত করবে, কিন্তু কোনো একক দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা সৃষ্টি করবে না।

চতুর্থত, আন্তর্জাতিক আইনের কঠোর ও ধারাবাহিক প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘ সনদে বর্ণিত সার্বভৌম সমতা ও বিরোধ নিষ্পত্তির নীতিমালা সব রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত। সবশেষে, মানবিক ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক আস্থার মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিশ্চিত না হলে কোনো রাষ্ট্র বা অঞ্চলই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল থাকতে পারে না।

তবে স্থিতিশীলতার এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা মোটেও সহজ কাজ নয়। কারণ অনেক সময় রাষ্ট্রগুলো নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাব বা ভূখণ্ড বিস্তারের স্বার্থে সমঝোতাকে গুরুত্ব দিতে চায় না। এমনকি অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতাও সবসময় শান্তি নিশ্চিত করতে পারে না, কারণ রাষ্ট্রগুলো অনেক সময় অর্থনৈতিক লোকসান মেনে নিয়েও নিরাপত্তার স্বার্থে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। তাই শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে মানবিক নিরাপত্তাকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দিতে হবে।

পরিশেষে, বিশ্বকে স্থিতিশীল করার লক্ষ্যে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপকে বাস্তব ঘটনা, তুলনামূলক গবেষণা এবং পরিমাপযোগ্য সূচকের ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে। কেবল যুদ্ধবিরতি নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সমঝোতা ও সংঘাত পুনরাবৃত্তির পথ বন্ধ করাই হবে প্রকৃত সাফল্যের চাবিকাঠি। এই পুরো প্রক্রিয়ার বিশ্লেষণ করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সুলতান মাহমুদ রানা।