মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসনবিরোধী অভিযানে ধারাবাহিকভাবে চলছে ব্যাপক ধরপাকড়। দেশটির বিভিন্ন কর্মক্ষেত্র, নির্মাণাধীন প্রকল্প, কারখানা, রেস্তোরাঁ ও আবাসিক এলাকায় চলমান এসব অভিযানে বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের সাথে বাংলাদেশি কর্মীরাও গ্রেফতারের শিকার হচ্ছেন। যারা বৈধ নথিপত্র ছাড়া অবস্থান করছেন কিংবা ভিসার মেয়াদের শর্ত ভঙ্গ করেছেন, তাদের অনেকেরই দেশে ফেরত যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অনিশ্চয়তার এই সময়ে প্রবাসীদের জীবনে নেমে এসেছে গভীর উদ্বেগের ছায়া। পরিবারের ভরণপোষণ, ঋণের বোঝা আর দেশে স্বজনদের ভবিষ্যৎ সবকিছু সামলে যারা রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন, তাদের অনেকের জীবনেই এখন অনিশ্চয়তার ছায়া। এ কারণে বাংলাদেশি কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগ দেশজুড়ে ১১ হাজার ১১০টি অভিযান পরিচালনা করেছে। এই সময়ের মধ্যে ১ লাখ ৪৮ হাজার ১৫৩ জনের নথিপত্র যাচাই করা হয়েছে, যার বিপরীতে ৬৫ হাজার ৬৯৯ জন অবৈধ অভিবাসীকে আটক করা হয়েছে। একই সাথে অনিয়মের অভিযোগে ১ হাজার ৯৬৬ জন নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৪৫ হাজার ৫৯৭ জন বিদেশিকে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে বলে সরকারি তথ্য থেকে জানা যায়। মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত দেশজুড়ে ১১ হাজার ১১০টি অভিযানে ৬৫ হাজার ৬৯৯ জন অবৈধ অভিবাসীকে আটক করা হয়েছে। এ পরিসংখ্যান মালয়েশিয়ায় অভিবাসন আইন প্রয়োগের ব্যাপকতা তুলে ধরলেও বাংলাদেশি নাগরিকদের মধ্যে কতজন আটক ও প্রত্যাবাসিত হয়েছেন, সামগ্রিক হিসাবে তার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ নেই। ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন অপরাধে ১ হাজার ৯৬৬ জন নিয়োগকর্তাকে আটক করার তথ্য তারই ইঙ্গিত দেয়।
অভিযানের তীব্রতা বেড়েছে অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময়ে। মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে, ১২ থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত ২৫২টি অভিযানে ৪ হাজার ৯০৭ জনের নথিপত্র পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ২ হাজার ১৫৬ জনকে আটক করা হয়েছে এবং ৫১ জন নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগের স্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী, বৈধ ভ্রমণ নথির অভাব, ভিসার মেয়াদ পার হওয়া, শর্তের বাইরে কাজ করা কিংবা সামাজিক ভ্রমণ ভিসায় এসে অবৈধভাবে কর্মে যোগ দেওয়া আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
এর আগেও বিভিন্ন সময়ে চালানো সমন্বিত অভিযানে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশিকে আটকের ঘটনা ঘটেছে। উদাহরণস্বরূপ, গত ১৩ সেপ্টেম্বর কুয়ালালামপুরের লেবুহ পুদু এলাকায় পরিচালিত অভিযানে ৪৭২ জনের মধ্যে ৩৬৪ জনই ছিলেন বাংলাদেশি। একই রকমভাবে, ৮ অক্টোবর সেলাঙ্গরের সেরি কেম্বাঙ্গান ও বান্দার বারু ক্লাং এলাকায় ৩০৭ জনকে যাচাই করে ১৭৪ জনকে আটক করা হয়, যাদের মধ্যে পাঁচজন বাংলাদেশি ছিলেন। এসব অভিযানে ছয়জন স্থানীয় নিয়োগকর্তাকেও আটক করা হয়েছে।
অভিবাসন সংক্রান্ত আর্থিক লেনদেনের তথ্যে দেখা যায়, ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের দায়ে নিয়োগকর্তাদের কাছ থেকে ৪ কোটি ১২ লাখ ৫৭ হাজার ৭৫০ রিঙ্গিত এবং বিদেশি অভিবাসীদের কাছ থেকে ৩ কোটি ৭১ লাখ ২৩ হাজার ৪২০ রিঙ্গিত জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
এদিকে, স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার সুযোগ সম্বলিত ‘মাইগ্র্যান্ট রিপ্যাট্রিয়েশন প্রোগ্রাম ২.০’ কর্মসূচিতে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩ লাখ ১২ হাজার ১৪৬ জন নিবন্ধন করেছেন। তবে কর্মসূচিতে নিবন্ধনের সংখ্যা মানেই সবাই দেশে ফিরে গেছেন, এমন নয়।
এই কর্মসূচি বাবদ ১৫ কোটি ৫৯ লাখ ৮৮ হাজার ১৪০ রিঙ্গিত সরকারি কোষাগারে জমা পড়েছে। তবে নিবন্ধিত সবার দেশে ফেরা নিশ্চিত হয়েছে কিনা, তা নিয়ে পরিসংখ্যানগত পার্থক্যের সুযোগ রয়েছে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের দুর্দশার মূলে রয়েছে নিয়োগপ্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতা, দালালের প্রতারণা এবং কর্মানুমতি নবায়নে নিয়োগকর্তাদের গড়িমসি। অনেক কর্মী বৈধ ভিসা নিয়ে এসেও শেষ পর্যন্ত প্রতারণার শিকার হয়ে বা কর্মানুমতি না পেয়ে অনিয়মিত হয়ে পড়েন। তবে সব আটক ব্যক্তিকে একই পাল্লায় মাপা ঠিক নয়। কারও নথিপত্রে সামান্য ত্রুটি থাকতে পারে, আবার কেউ পরিস্থিতির শিকার। তাই আটক প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ধরন যাচাই করে আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
প্রবাসীদের সুরক্ষার বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কমিউনিটি নেতা বলেন, দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের অবদান অপরিসীম। অথচ তারা যখন প্রতারণার শিকার হয়ে অবৈধতার ফাঁদে পড়েন, তখন তার পুরো দায় কর্মীর ওপর চাপানো অযৌক্তিক। তিনি মনে করেন, শুধু ধরপাকড় দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বরং নিয়োগকর্তাদের আইনগত বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা এবং প্রতারণাকারী দালালদের মূলোৎপাটন করা জরুরি।
মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশিদের প্রতি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যে, তারা যেন পাসপোর্ট, ভিসা ও কর্মানুমতির মেয়াদ নিয়মিত যাচাই করেন। নিয়োগকর্তার আশ্বাসের ওপর নির্ভর না করে নিজেরাই বৈধতা সম্পর্কে নিশ্চিত থাকা জরুরি। কোনো কাগজপত্রে সমস্যা দেখা দিলে দালালের কাছে অর্থ ব্যয় না করে বাংলাদেশ হাইকমিশন বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সহায়তা নেওয়া উচিত। যারা অনিয়মিত হয়ে পড়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে সরকারি প্রত্যাবাসন কর্মসূচির নিয়ম ও শর্তাবলি সম্পর্কে সঠিক তথ্য জেনে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
আটক কর্মীদের ক্ষেত্রে পরিচয় ও নথিপত্র যথাযথভাবে যাচাই করা, কনস্যুলার সহায়তা নিশ্চিত করা এবং বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও কেউ হয়রানির শিকার হলে তা অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা থাকা জরুরি। পরিশেষে, রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষের মধ্যে পারস্পরিক তথ্য বিনিময় এবং সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। শুধু অভিযান নয়, অবৈধতার মূল কারণগুলো বন্ধ করাই হতে পারে স্থায়ী সমাধান।