হবিগঞ্জ শহরতলির ধুলিয়াখাল এলাকায় স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের আবাসনের স্বপ্ন নিয়ে ২০১৬ সালে গ্রহণ করা হয় ‘সাইট অ্যান্ড সার্ভিসেস আবাসিক প্লট উন্নয়ন প্রকল্প’। হবিগঞ্জের বাসিন্দাদের মধ্যে এ রকম আবেদনকারী ৬৯৬ জন। হবিগঞ্জ শহরে ব্যবসা করেন কামাল আহমেদ।
২০১৭ সালে অনুমোদন পাওয়া এই প্রকল্পের অধীনে ২৭ কোটি ৪১ লাখ টাকা ব্যয়ে ইতিমধ্যে সাড়ে ১৬ একর জমি অধিগ্রহণ ও মাটি ভরাটের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পের অধীনে ১৩২টি আবাসিক প্লট বরাদ্দের জন্য চলতি বছরের শুরুর দিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ। আবেদন গ্রহণের শেষ সময় ছিল ফেব্রুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত। নির্ধারিত ওই সময়ের মধ্যে প্রায় ১১০০ আবেদনপত্র বিক্রি হয় এবং জামানতসহ মোট ৬৯৬টি আবেদন জমা পড়ে। প্লটের আকারের ওপর ভিত্তি করে চার কাঠা বা তার বড় প্লটের জন্য দুই লাখ এবং চার কাঠার ছোট প্লটের জন্য দেড় লাখ টাকা করে জামানত নেওয়া হয়েছে। গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, সব মিলিয়ে জামানত বাবদ জমা হওয়া অর্থের পরিমাণ প্রায় পাঁচ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে প্রকল্পটির ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) অনুমোদন পায়। ১৩২ প্লটের জন্য ৬৯৬ আবেদন গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ সিলেট বিভাগীয় কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের শুরুতে প্লট বরাদ্দের জন্য জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে আবেদন আহ্বান করা হয়। গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের এই প্রকল্পের প্রসপেক্টাস (বিবরণপত্র) থেকে জানা গেছে, প্রকল্পে কাঠাপ্রতি জমির আনুমানিক দাম পড়বে পাঁচ লাখ ১৩ হাজার টাকা করে। তাঁদের ভাষ্য, সরকারি নিয়ম মেনে তাঁরা আবেদন ও জামানত জমা দিয়েছেন। একটি বেসরকারি ব্যাংকের চাকরিজীবী মো. হাবিবুর রহমানও প্লটের জন্য আবেদন করেছেন। দীর্ঘদিন কর্তৃপক্ষের কাছে পড়ে থাকায় অনেকেই অসহায়ত্ব বোধ করছেন।
প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী, প্লট বরাদ্দ পাওয়ার পর কিস্তিতে বা এককালীন অর্থ পরিশোধের সুযোগ রয়েছে। বরাদ্দ না পাওয়া আবেদনকারীদের জামানতের অর্থ ফেরত দেওয়া হবে এবং বরাদ্দপত্র পাওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে নকশা অনুযায়ী বাড়ি নির্মাণ করতে হবে। তবে আট মাস পেরিয়ে গেলেও লটারির মাধ্যমে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। উল্টো এখন নতুন করে আবেদন গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। লটারি কেন স্থগিত হলো—এ বিষয়ে গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী নেজামুল হক মজুমদার জানান, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও হুইপ জি কে গউছের অনুরোধে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে লটারি কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে এবং নতুন আবেদনের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে। তবে হবিগঞ্জ-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও হুইপ জি কে গউছ চান নতুন করে আবেদন নেওয়া হোক।
নতুন আবেদনের এই সিদ্ধান্তে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন বর্তমান আবেদনকারীরা। সংসদ সদস্য জি কে গউছ জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় অনেক মানুষ এ আবেদনের বিষয়ে জানতে পারেননি, তাই নতুন আবেদনের সুযোগ দিলে অংশগ্রহণ বাড়বে। তবে বরাদ্দ প্রক্রিয়া লটারির মাধ্যমেই নিরপেক্ষভাবে হওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন। প্রকৌশলী নেজামুল হক মজুমদার বলেন, ‘আমি চেষ্টা করেছি মানুষ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, কিন্তু মন্ত্রণালয়ের আদেশ অনুযায়ী নতুন আবেদন নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। আগের জমা হওয়া আবেদনের সঙ্গে নতুনগুলো যুক্ত করে লটারি হবে।’
এই নতুন উদ্যোগকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। প্লটপ্রত্যাশী ও ব্যবসায়ী কামাল আহমেদের মতে, এত আবেদন জমা পড়ার পর নতুন করে আবেদনের সুযোগ দেওয়া মূলত রাজনৈতিক প্রভাবে নিজেদের মধ্যে প্লট ভাগাভাগির কৌশল। একজন ব্যাংক কর্মকর্তা মো. হাবিবুর রহমান জানান, সীমিত আয়ের মানুষ হিসেবে কষ্টার্জিত অর্থ জামানত রেখে আট মাস ধরে অপেক্ষায় আছেন। এখন পুনরায় আবেদন নেওয়ার সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। যখন প্লট বরাদ্দের কথা, ঠিক আগমুহূর্তে বিধি ভেঙে নতুন করে আরও আবেদন নেওয়ার অর্থ দুর্নীতির সুযোগ খোঁজা। তিনি বলেন, ‘এত আবেদন জমা হওয়ার পরও পুনরায় আবেদনের সুযোগ করে দেওয়া মানেই দলীয় নেতা-কর্মীদের এ প্রক্রিয়ায় ঢোকানো এবং নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা করা। আমরা যে আশা নিয়ে আবেদন করেছিলাম, আমাদের সেই স্বপ্নের জায়গায় অনিয়ম–দুর্নীতির সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে।’। এরপরও যদি আবারও নতুন আবেদন নেওয়াই লাগে, তাহলে আট মাস পরে কেন এ সিদ্ধান্ত?’।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) হবিগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক মিছবাহুল বারী মনে করেন, স্বল্প আয়ের মানুষ শেষ সম্বল দিয়ে জামানত জমা দিয়ে দীর্ঘ আট মাস অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। এখন নতুন করে আবেদন নেওয়ার নামে সময়ক্ষেপণ করা হলে আবেদনকারীরা আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কর্তৃপক্ষের উচিত নতুন কোনো জটিলতা তৈরি না করে জমাকৃত আবেদন থেকেই স্বচ্ছতার সঙ্গে লটারির মাধ্যমে প্লট বরাদ্দ প্রদান করা।