কুড়িগ্রামের রাজারহাটে অনুষ্ঠিত এক সরকারি কর্মসূচিতে মাত্র দেড় মিনিটের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলুকে ৩৫ বার ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করে স্থানীয় প্রশাসনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানজিলা তাসনিম। গত বুধবার (২১ অক্টোবর) আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে তার বক্তব্যের এমন সম্ভাষণ রীতি সামাজিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে গুঞ্জনের রূপ নেয়। তবে কেবল এই সম্ভাষণই নয়, ইউএনও তার বক্তব্যে এলাকার উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষার প্রসার ও সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা সংক্রান্ত নানা দাবিও মন্ত্রীর সম্মুখে পেশ করেন। এ ছাড়া, স্যার আপনি অনেকগুলো বলেছেন। যে আলাদা বস্তা করা বা চেয়ারম্যানরা যে সমস্যায় পড়ে তাদের লোড-আনলোডের ব্যাপারে পরিবহণের বিষয়গুলো ইতোমধ্যে স্যার আপনি উদ্যোগ নিয়েছেন।

ঘটনাটি ঘটে বুধবার বেলা ১১টায় রাজারহাট উপজেলার বৈদ্যের বাজার হরিসভা সংস্কৃতি দুর্গা মন্দির প্রাঙ্গণে। শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে স্থানীয় অসচ্ছল হরিজন, রবিদাস ও বেদে সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে শাড়ি বিতরণ করতে এই সমাবেশের আয়োজন করেছিল কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসন। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু। পুরো অনুষ্ঠানটিতে এক শতাধিক শাড়ি বিতরণ করা হয়। সেখানে বিশেষ বক্তব্যে ইউএনও তানজিলা তাসনিম স্থানীয় ও প্রশাসনিক বিভিন্ন বিষয়ের ওপর আলোকপাত করেন।

বক্তব্যের মূলভাগে ইউএনও রাজারহাটে একটি নতুন সার্ভেয়ার কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেন। তিনি জানান, সরকার বর্তমানে কারিগরি শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করছে এবং ভূমিসংক্রান্ত কার্যাবলীতে দক্ষতার সুনির্দিষ্ট প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সিলেটে নিজ গৃহ জেলা এবং সেখানকার বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের কথা টেনে তানজিলা তাসনিম উল্লেখ করেন, রাজারহাটে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে একটি সার্ভেয়ার কলেজ তৈরি হলে স্থানীয়দের পাশাপাশি গোটা উত্তরবঙ্গের বাসিন্দারা ভূমিসংক্রান্ত প্রশিক্ষণ পাবেন ও উপকৃত হবেন। এই প্রস্তাবটি মন্ত্রিপরিষদে যথা সময়ে পেশ করার জন্য ত্রাণমন্ত্রীর প্রতি তিনি বিনীত আরজি জানান। পাঠকের জন্য ইউএনও তানজিলা তাসনিমের হুবহু বক্তব্যটি তুলে ধরা হলো। যেহেতু আপনি জানেন যে তারা চায় না এবং স্যার, আমার বাড়িও সিলেটে, স্যার এবং আমাদের এখানে আমি যেভাবে আমাদের বিভিন্ন স্যার দেখি যে প্রবাসী বা অন্যান্য অনেক বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ স্যার। আপনি জানেন স্যার ভূমির বিভিন্ন ইস্যুতে আমরা কিন্তু সার্ভেয়ার সংকটে ভুগছি, স্যার। বেসরকারি সার্ভেয়ার কলেজ করলে হয়তো, স্যার আপনার বা আপনাদের এই সবগুলো মোটামুটি উত্তরবঙ্গের অনেকেই স্যার উপকৃত হতো, স্যার। টেকনিক্যাল জ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গে স্যার, এটা কিন্তু স্যার, আশা করব, স্যার। মন্ত্রিপরিষদে উত্থাপন করবেন সময়মতো, স্যার। আর স্যার আজকে যেহেতু সুযোগ পেয়েছি স্যার। আমাদের সব সরকারি চাকরীজীবির পক্ষ থেকে সুদীর্ঘ একটা অপেক্ষার পর স্যার একটা পে-স্কেল হয়েছে। অসংখ্য কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি, আমি আমাদের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সাংবাদিক এবং আমাদের এখানকার যারা স্যার লোকাল রাজনৈতিক বিশেষ করে বিএনপির নেতৃবৃন্দ আছেন।

তিনি বক্তব্যে সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের প্রশংসা করতে গিয়ে ভিজিএফের চাল বণ্টনের নতুন পদ্ধতির ইতিবাচক প্রভাব তুলে ধরেন। চাল বস্তাবন্দি করে সরবরাহ করায় বস্তা ওঠানো-নামানোর দুর্ভোগ অনেকাংশে লাঘব হয়েছে এবং এটি ইউপি চেয়ারম্যানদের ভোগান্তি কমিয়েছে বলে তিনি জানান। একই সাথে রাজারহাটের নবনির্মিত প্রশাসনিক ভবন শুভ উদ্বোধন এবং পূজায় অসচ্ছল জনগোষ্ঠীর জন্য উপহার পাঠানোর জন্য তিনি মন্ত্রীর প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এটির জন্য আল্লাহর কাছে অশেষ কৃতজ্ঞতা, স্যার।

কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা অনুযায়ী নবম পে-স্কেল ঘোষণা করায় ইউএনও তানজিলা তাসনিম স্বস্তির কথা তুলে ধরেন। তিনি প্রকাশ করেন যে, এই পে-স্কেল সরকারি কর্মচারীদের কাজে নতুন উদ্দীপনা ও গতিশীলতা সঞ্চার করবে। এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের জন্য তিনি ত্রাণমন্ত্রীর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান ও সশ্রদ্ধ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক বলে উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক দলগুলোর সহায়তায় প্রতিমা বিসর্জন অনুষ্ঠানও শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হবে। তার মতে, এ উদ্যোগ চাকরিজীবীদের কাজের উদ্দীপনা বাড়াবে।

অনুষ্ঠানে জেলা পর্যায় ও স্থানীয় প্রশাসনের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গসহ নানা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিতদের মধ্যে কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ, জেলা পুলিশ সুপার ফজলে রাব্বি, জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সদস্যসচিব সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা, এবং উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট শফিকুর রহমান ও সদস্যসচিব সাহিদুল ইসলাম অন্যতম। নেতৃবৃন্দ ও প্রশাসনিক কর্তাদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি সুসম্পন্ন হয়।

তবে বক্তব্যে উন্নয়ন দাবি কিংবা প্রশাসনিক প্রশংসা ছাপিয়ে তানজিলা তাসনিমের ঘনঘন ‘স্যার’ বলাটাই প্রধান আলোচনার উপজীব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। বক্তব্যের বিবরণ অনুযায়ী তিনি সূচনা থেকে সমাপ্তি পর্যন্ত প্রায় প্রতি বাক্যে একাধিকবার ‘স্যার’ শব্দ ব্যবহার করেন। শুরুতেই সিলেট ও স্থানীয় অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে পরপর কয়েকবার ‘স্যার’ বলেন। পরবর্তীতে কারিগরি শিক্ষা, সার্ভেয়ার সংকট, ভিজিএফ চালের ব্যবস্থা, পে-স্কেল এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে স্থানীয় বিএনপির সহায়তা পাওয়ার বিষয়টি ব্যক্ত করতে গিয়েও প্রতি মুহূর্তে মন্ত্রীকে ‘স্যার’ সম্বোধনে সম্মান জানান তিনি, যা সবমিলিয়ে দেড় মিনিটে ৩৫ বারে গিয়ে পৌঁছে।