দেশের ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো সাম্প্রতিক স্থবিরতা ও নানা চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগের সর্বশেষ মাসভিত্তিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই মাসের তুলনায় আগস্টে এসব ব্যাংকের আমানত, বিনিয়োগ, রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক বাণিজ্যসহ মূল সূচকগুলোতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে প্রচলিত ধারা থেকে পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকে রূপান্তরের প্রস্তুতি নিচ্ছে এনসিসি ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট মাস শেষে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোতে মোট আমানতের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৯২ হাজার ৫০ কোটি টাকায়। জুলাই মাসে যার পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে আমানত বেড়েছে ৩ হাজার ৫০৮ কোটি টাকা বা ০.৯০ শতাংশ। তবে আগের বছরের একই সময়ের (আগস্ট ২০২৫) তুলনায় এই আমানত ১.৬৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল।
ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাতের অর্থায়নেও ইসলামি ব্যাংকগুলোর অবদান অব্যাহত রয়েছে। আগস্ট শেষে এসব ব্যাংকের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪২ হাজার ১০৭ কোটি টাকা, যা জুলাই শেষে ছিল ৫ লাখ ৪২ হাজার ২৮ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের আগস্টে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ২৪ হাজার ৪৯৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত এক বছরে ইসলামি ধারার ব্যাংকে বিনিয়োগ বেড়েছে ১৭ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা বা ০.৩৩৬ শতাংশ।
রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় আহরণে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। গত আগস্টে ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৬২ কোটি ৫০ লাখ ডলার, যা জুলাই মাসের (৫৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার) চেয়ে ১৬.২০ শতাংশ বা ৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার বেশি। বৈদেশিক বাণিজ্যেও মিশ্র প্রভাব দেখা গেছে; আগস্ট মাসে এই ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে আমদানি হয়েছে ৭৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার, যা জুলাই মাসের (৭১ কোটি ৩০ লাখ ডলার) চেয়ে ৪.৮৯ শতাংশ এবং আগের বছরের আগস্টের তুলনায় ৬.৫১ শতাংশ বেশি। তবে আগস্টে রপ্তানি আয় কিছুটা কমে ৫২ কোটি ৯০ লাখ ডলারে নেমেছে, যা জুলাইয়ে ছিল ৫৬ কোটি ডলার।
বর্তমানে দেশে মোট ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ধারার ব্যাংক পরিচালিত হচ্ছে। এগুলো হলো ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক। এর মধ্যে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক একীভূত হয়ে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। আগস্ট শেষে এসব ব্যাংকের মোট জনবল দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার ১২৪ জনে, যা জুলাই মাসে ছিল ৪২ হাজার ১১৫ জন। কার্যক্রমে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক।
এদিকে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাওয়ায় নিজেদের ব্যবসায়িক ধারা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনসিসি ব্যাংক। ব্যাংকটি প্রচলিত ব্যাংকিং থেকে পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। ইতোমধ্যে তারা চারটি শাখা পূর্ণাঙ্গ ইসলামি শাখায় রূপান্তর করেছে এবং চলতি বছরে আরও কয়েকটি শাখা পরিবর্তন ও নতুন উইন্ডো খোলার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। আগামী বছরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংক হিসেবে আত্মপ্রকাশের লক্ষ্যে এনসিসি ব্যাংক প্রয়োজনীয় রূপরেখা ও নথি বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিয়েছে।
এনসিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান নূরুন নেওয়াজ জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যাবতীয় নির্দেশনা মেনে এনসিসি ব্যাংককে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকে রূপান্তরের প্রস্তুতি চলছে। নতুন ধারায় যাত্রার সঙ্গে সংগতি রেখে ব্যাংকটির নামও পরিবর্তন করা হবে। এর আগে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক একইভাবে পরিবর্তিত হয়ে যথাক্রমে স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক নাম ধারণ করেছিল।
ইসলামি ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এনসিসি ব্যাংক সেপ্টেম্বরে ৬২টি প্রচলিত শাখায় ‘ইসলামিক ব্যাংকিং উইন্ডো’ চালুর অনুমতি চেয়ে আবেদন জানায়, যার মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে ৪০টি শাখাকে অনুমোদন দিয়েছে। পর্যায়ক্রমে এসব উইন্ডো পূর্ণাঙ্গ ইসলামি শাখায় উন্নীত করা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেওয়া আর্থিক চিত্র অনুযায়ী, এনসিসি ব্যাংকের ইসলামি ব্যাংকিংয়ে বর্তমানে মোট আমানত ১ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা, সুকুক বন্ডে বিনিয়োগ ৪৪৮ কোটি টাকা এবং বিনিয়োগের জন্য আরও ৮০০ কোটি টাকা ছাড়ের অপেক্ষায় রয়েছে।
উইন্ডোগুলোর মাধ্যমে ব্যবসার পরিধি বাড়তে থাকায় ব্যাংকটি তাদের জনবল দক্ষ করতে বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক ফাইন্যান্সের (বিআইআইএফ) মাধ্যমে ৩৬৩ জন কর্মকর্তাকে ছয় দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অনলাইন ও সরাসরি পদ্ধতির মাধ্যমে এ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ২০০ কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। ব্যাংকের সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এই শরিয়াহভিত্তিক প্রশিক্ষণের আওতায় আনার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।