বাংলাদেশের প্রস্তাবিত ২০২৬ সালের খসড়া সাইবার নিরাপত্তা আইনের বিভিন্ন দিক নিয়ে তীব্র উদ্বেগ জানিয়েছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ‘লা ফুনেত্র দ্য পারিস’। সংস্থাটি বলছে, আইনের অস্পষ্ট ধারা, বিচারিক তদারকি ছাড়া অনলাইন কনটেন্ট বন্ধের ক্ষমতা এবং বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের বিধান স্বাধীন সাংবাদিকতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে। প্যারিসভিত্তিক এই সংগঠনটির বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, প্রস্তাবিত এই কাঠামো সাংবাদিক, কার্টুনিস্ট ও মানবাধিকারকর্মীদের নিরাপত্তাকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করতে পারে। প্রস্তাবিত কাঠামোয় জামিন অযোগ্য অপরাধের কঠোর বিধান বহাল রাখা হয়েছে। সংস্থাটি বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষকে মুক্ত গণমাধ্যম রক্ষায় আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর যেকোনো বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষেত্রে তিনটি শর্ত পূরণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছে এই সংস্থা।
বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ এবং জব্দ বা গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে বিচারিক অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তা তুলে দেওয়ায় প্রশাসনিক নিপীড়ন ও নজরদারির ঝুঁকি বেড়েছে। এ ছাড়া আইনে ‘গুজব’ ও ‘ভুল তথ্য’-এর মতো অস্পষ্ট শব্দগুলোকে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়েছে, যা গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে এক ধরনের স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এতে করে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক গঠনমূলক সমালোচনার জায়গাটি সংকুচিত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড সমুন্নত রাখার আহ্বান জানিয়ে সংস্থাটি মনে করিয়ে দেয়, সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং তথ্য আদান-প্রদানের অধিকার স্বীকৃত। যে কোনো আইনি বিধিনিষেধ অবশ্যই স্পষ্ট আইনের ভিত্তিতে, বৈধ প্রয়োজনে এবং আনুপাতিক হারে হতে হয়। বর্তমান খসড়া আইনটি এই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ বলে তাদের দাবি।
বাংলাদেশ সরকারের প্রতি সংস্থাটি আহ্বান জানিয়েছে যেন দ্রুত প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা হয়। বিশেষ করে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আগে বিচারিক অনুমোদন পুনর্বহাল, সাইবার অপরাধের সুনির্দিষ্ট আইনি সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং জনস্বার্থমূলক সাংবাদিকতাকে সুরক্ষার দাবি জানিয়েছে তারা। এছাড়া বাংলাদেশের সম্পাদক পরিষদ ও সুশীল সমাজের উদ্বেগের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে, সরকার যেন অবিলম্বে এই বিতর্কিত ধারাগুলো পর্যালোচনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আইন নিশ্চিত করে, সেই তাগিদ দেওয়া হয়েছে।