নিজেদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে এবং মার্কিন ডলারের ওপর অতি-নির্ভরতা কমাতে গত ২৩ মাস ধরে বিরামহীনভাবে সোনা সংগ্রহ করছে চীন। ঝেং আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সেখানকার কিছু সভেরেন্ট ওয়েলথ ফান্ড সোনা বিক্রি করেছে। বিদেশি ক্রেতারা যদি ইউয়ান ব্যবহার করে হংকং থেকে সোনা কিনতে এবং তা বুঝে নিতে পারেন, তাহলে তাঁদের ইউয়ান সংগ্রহ ও নিজেদের কাছে রাখার আগ্রহ বাড়তে পারে।

এই ধারাবাহিকতায় সেপ্টেম্বর মাসে পিপলস ব্যাংক অব চায়না (পিবিওসি) তাদের মজুত আরও ৭ লাখ ৪০ হাজার আউন্স বাড়িয়েছে। আগস্ট মাসে এই পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৫০ হাজার আউন্স। ফলে চীনের মোট সোনার মজুত এখন প্রায় ৭ কোটি ৭৪ লাখ ৭০ হাজার আউন্স বা ২ হাজার ৪০৯ দশমিক ৫৯ টনে দাঁড়িয়েছে। চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে জাতীয়তাবাদী বক্তব্যও দেখা যাচ্ছে।

বাজারে সোনার চাহিদা ও আমদানির চিত্র

শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকই নয়, চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারেও সোনার ব্যাপক চাহিদা পরিলক্ষিত হচ্ছে। ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে দেশটি ১ হাজার টনের বেশি সোনা আমদানি করেছে, যার বাজারমূল্য ১৫ হাজার ৮৮০ কোটি মার্কিন ডলার। তুলনায় ২০২৫ সালের পুরো বছরে চীন ৮৮৬ টন সোনা আমদানি করেছিল, যার মূল্য ছিল ৯ হাজার ৬৫০ কোটি ডলার। চীনের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রায় ৯ শতাংশ বর্তমানে সোনার দখলে রয়েছে। কথাটি বাস্তবতার তুলনায় কিছুটা অতিরঞ্জিত হলেও চীনের কয়েকজন বিশ্লেষকের কাছে সোনার কৌশলগত গুরুত্ব কতটা বেড়েছে, তা বোঝা যায়। ওয়েইবোতে প্রকাশিত একটি পোস্টে দাবি করা হয়েছে, চীনের সবচেয়ে ধনী ১০ কোটি মানুষ প্রত্যেকে ৮০ হাজার ইউয়ান করে দিলে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের হাতে থাকা সব সোনা কিনে নেওয়া সম্ভব। অন্যদিকে, হংকংয়ের বিকাশমান সোনার বাজারের মাধ্যমে সেই সোনা সংরক্ষণ, কেনাবেচা ও লেনদেন নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

বিশ্লেষকদের মতামত ও কৌশলগত গুরুত্ব

  • চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ঝিহুতে প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, সোনার নিয়ন্ত্রণ হাতে থাকাই আর্থিক নিরাপত্তার আসল চাবিকাঠি।
  • জিনরুই ফিউচার্সের বিশ্লেষক উ জিজিয়ে উল্লেখ করেন, ইউয়ানের শক্তিশালী অবস্থানের ফলে আমদানি ব্যয় হ্রাস পেয়েছে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো সোনা আমদানির কোটা সহজতর করেছে।
  • পিকটে ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের ঝেং ওয়াংছিং জানান, চীনের রপ্তানি আয় ও চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকায় বিদেশে সম্পদ কেনার সক্ষমতা বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ডের বিকল্প হিসেবে সোনা এখন বেইজিংয়ের প্রধান পছন্দ।
  • মধ্যপ্রাচ্যের সভেরেন্ট ওয়েলথ ফান্ডগুলোর সোনা বিক্রির চাপের মুখে চীনের এই বাড়তি চাহিদা বিশ্ববাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখছে।

ইউয়ানের বৈশ্বিক ব্যবহার ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতি

অনেক বিশ্লেষক চীনের সোনা কেনার উদ্যোগকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও লেনদেনে ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ানোর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখছেন।

এটি কেবল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মজুত বাড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর পেছনে হংকংয়ের বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক ও বিদেশের খনিগুলোতে চীনা বিনিয়োগের কৌশল কাজ করছে।

লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে খনি কিনে সরাসরি উৎপাদনস্থল থেকে সোনা সংগ্রহের মাধ্যমে বেইজিং নিজের প্রভাব বলয় বাড়াচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিভঙ্গি ও সতর্ক বিশ্লেষণ

  • গুওতাই জুনান ইন্টারন্যাশনালের ঝৌ হাও-এর মতে, দীর্ঘমেয়াদী সোনা ক্রয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইউয়ানের প্রতি আস্থা বাড়িয়েছে এবং ডলারের ওপর চাপ কমিয়েছে।
  • সিয়া ইংইং (নানহুয়া ফিউচার্স) বিষয়টিকে আরও বিশদভাবে দেখছেন, যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সোনা কেনার প্রবণতা ডলারের রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে একচ্ছত্র আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার সম্ভাবনা তৈরি করছে।
  • এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংসের তথ্যমতে, চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারের সঙ্গে সাংহাই গোল্ড এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে হংকংয়ের অফশোর গুদাম এবং ইউয়ানে নির্ধারিত সোনার চুক্তির নেটওয়ার্ক ভবিষ্যতে সিঙ্গাপুর, দুবাই ও মস্কো পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।

ডলারমুক্তকরণ ও আর্থিক নিরাপত্তা

চীনের এই পদক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতিতে ‘ডলারমুক্তকরণ’ নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, সোনা কেনার মূল উদ্দেশ্য ডলারের প্রভাব কমানোর চেয়ে বরং আর্থিক সংকট মোকাবিলায় সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক নীতি, ঋণ এবং নিষেধাজ্ঞা ব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ‘রংই ফাইন্যান্স’ নামক বিশ্লেষকের মতে, সোনার মজুত বাড়লে যেকোনো দেশের দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ে। রংই ফাইন্যান্স ছদ্মনামে লেখেন এমন একজন বিশ্লেষকও প্রায় একই কথা বলেছেন।

তবে ইউয়ানের প্রকৃত আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে চীনের বাজারের স্থায়িত্ব ও ইউয়ানকে অবাধে অন্য মুদ্রায় রূপান্তরের সুযোগের ওপর।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ডলারের দীর্ঘমেয়াদি শক্তি নিয়ে সংশয় থাকলেও বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় এর প্রভাব এখনো প্রশ্নাতীতভাবে শক্তিশালী।

চীনের কৌশলগত এই সোনা আহরণ মূলত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে নিজেকে আগলে রাখার একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মাত্র। তিনি তাইওয়ান-এশিয়া এক্সচেঞ্জ ফাউন্ডেশনের ফেলো।