চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার কচুয়াই ইউনিয়নের চক্রশালা গ্রামের মেয়ে অন্তু দে। অভাব-অনটনে বেড়ে ওঠা ১৮ বছর বয়সী এই তরুণী আজ ফুটবলের মাঠ কাঁপাচ্ছেন। বর্তমানে ছালেহ নূর ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অন্তুর স্বপ্ন, একদিন জাতীয় নারী ফুটবল দলে জায়গা করে নেওয়া। গ্রামের মেঠো পথ পেরিয়ে গাছপালার ভেতরে অন্তু দের বাড়ি। স্নাতক শেষে বিয়ে হয়েছে বড় মেয়ে তন্তু দের। ঘরে অন্তুর মা লক্ষ্মী দের সঙ্গে কথা হয়। ওই ম্যাচে পটিয়া জিতলেও পরবর্তী সময়ে আনোয়ারা উপজেলার দলের কাছে হেরে যায় অন্তুদের দল। প্রথম ম্যাচে ফেনীর কাছে চট্টগ্রাম ২-০ গোলে হেরে যায়।

অন্তর বাবা রতন দে একসময় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন, এখন গ্রামে ছোট একটি পানের দোকান চালান। চার বছর ধরে এ দোকান দিয়েই চলছে সংসার। পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা এতটাই প্রকট যে, তাদের টিন ও মাটির ঘরটি জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বৃষ্টির সময় ঘরের চালে ফুটো দিয়ে পানি পড়ে। এমন কষ্টের মধ্যেও মেয়ের ফুটবলের প্রতি অদম্য আগ্রহ দেখে বাবা-মা তাকে কখনো বাধা দেননি, বরং সাহস জুগিয়েছেন। সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, টিন ও মাটির তৈরি ছোট ঘরটির বিভিন্ন অংশ ভেঙে গেছে।

দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই ফুটবলের প্রতি অন্তুর টান। বাড়ির উঠানে প্রতিবেশী ছেলেদের সঙ্গে শৈশবের হাতেখড়ি। চাচাতো ভাই প্রকাশ দের উৎসাহে তিনি মাঠে যেতেন। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় বিদ্যালয়ভিত্তিক খেলায় অংশ নেওয়া শুরু। সেই সময় চক্রশালা কৃষি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাগর দে তার খেলা দেখে উৎসাহ দেন এবং বিদ্যালয়ের দলের অধিনায়ক করেন। পটিয়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে আয়োজিত উপজেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনি দুবার সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও পান। তাঁর খেলা দেখে তখন বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে থাকা সাগর দে তাঁকে বেশ উৎসাহ দিতেন। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় অনূর্ধ্ব-১৭ নারী ফুটবল প্রতিযোগিতায় খেলার সুযোগ হয় তাঁর।

২০১৮ সালে স্থানীয় সংগঠক সৈয়দ সাইফুল ইসলামের সঙ্গে পরিচয়ের পর অন্তুর জীবনে নতুন মোড় আসে। সাইফুল ইসলামের প্রতিষ্ঠিত পটিয়া মহিলা ফুটবল একাডেমিতে যুক্ত হয়ে তিনি নিয়মিত অনুশীলন শুরু করেন। মাত্র দুই দিনের প্রস্তুতির পর ২০১৮ সালের ১৮ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দর স্টেডিয়ামে লোহাগাড়া উপজেলার বিপক্ষে তার অভিষেক হয়। তবে সে সময় নিয়মিত অনুশীলনের জন্য আলাদা মাঠ না থাকায় পটিয়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে ছেলেদের সঙ্গেই অনুশীলন করতে হতো তাকে। এ নিয়ে মাঠ সংকট প্রকট বলে আক্ষেপ রয়েছে তার। ২০১৮ সালের দিকে তৎকালীন প্রধান শিক্ষক সমর কান্তি দে ও উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিনের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় স্থানীয় নারী ফুটবলের সংগঠক সৈয়দ সাইফুল ইসলামের সঙ্গে। মাঠে অনুশীলন কিংবা বিভিন্ন জায়গায় খেলতে যাওয়ার সময় তিনি এখনো সহযোগিতা করেন।

অন্তর খেলার ক্যারিয়ার বেশ সমৃদ্ধ।

জেলা পর্যায়ের বাছাইয়ে ৪০ জনের মধ্যে সেরা ১৮ জনের তালিকায় সুযোগ পেয়ে তিনি ১১ জনের মূল দলে জায়গা করে নেন।

২০২০ সালে ঢাকায় বিভাগীয় পর্যায়ে অংশ নেন। একই বছর সিলেটে আনোয়ারার হয়ে প্রতিযোগিতায় খেলেন। এছাড়া রংপুর, কক্সবাজার, কুমিল্লা, বগুড়া, নীলফামারী, চুয়াডাঙ্গা ও জয়পুরহাটের মতো বিভিন্ন জেলায় বিভিন্ন দলের হয়ে খেলার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। ২০২১ সালের যুব গেমসে চট্টগ্রাম জেলা দলের চ্যাম্পিয়ন হওয়া এবং ফেনীতে বিভাগীয় পর্যায়ে রানারআপ দলের সদস্য ছিলেন অন্তু। ২০২৫ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশ উইমেনস লিগে ফরাশগঞ্জ স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে খেলে রানারআপ হন। বাংলাদেশ ফুটসাল লিগে চাঁদপুর ফুটবল ক্লাবের হয়েও খেলেছেন তিনি। এ পর্যন্ত তিনি চারটি সেরা খেলোয়াড় ও পাঁচটি ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ পুরস্কার জিতেছেন। ছেলে সৈকত দে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে একটি মুরগির খামার করছেন।

খেলাধুলার পাশাপাশি অন্তু এখন নিজের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ফুটবল প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। এ নিয়ে চক্রশালা কৃষি উচ্চবিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষক নাছির উদ্দিন বলেন, ‘সে আমাদের গর্ব। নিজেকে খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি অন্যদেরও সে শিখিয়ে তুলছে।’ নিজেকেই কেবল সে খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তোলেনি, স্কুলের অন্য শিক্ষার্থীদেরও ফুটবলার হিসেবে গড়ে তুলছে।’।

অন্তর সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছেন পটিয়া মহিলা ফুটবল একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা ডা. সৈয়দ সাইফুল ইসলাম। তিনি জানান, প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়েদের জাতীয় পর্যায়ে খেলার সুযোগ করে দিতেই এই একাডেমি গড়ে তোলা হয়েছে। অন্তুর মতো মেধাবী খেলোয়াড়দের তিনি আর্থিকভাবেও সহায়তা করেছেন। এছাড়া একাডেমির কোচ নাছরিন আক্তার অন্তুর নিয়মিত অনুশীলনের ওপর জোর দেন। তাঁদের সহায়তা না পেলে এত দূর আশা কঠিন হতো। নাছরিন আক্তার জানান, ২০১৭ সালে এলাকার নারী খেলোয়াড়দের নিয়ে কাজ শুরু করেন সৈয়দ সাইফুল ইসলাম। অন্তু এই একাডেমির ভালো ফুটবলারদের মধ্যে অন্যতম। কিন্তু গ্রাম পর্যায়ে তাঁদের উৎসাহ দিতে না পারলে তাঁদের পক্ষে এগিয়ে যাওয়া কঠিন। অন্তু দের মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড়েরা এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন।’।

শুরুতে মেয়ে হয়ে ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলা ও পোশাকের কারণে অনেক কটূক্তি শুনতে হয়েছে অন্তুকে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এলাকার মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টেছে এবং সবাই এখন তাকে উৎসাহ দিচ্ছে। বর্তমানে জাতীয় পর্যায়ের নারী ফুটবলার শামসুন্নাহারকে অনুসরণ করেন অন্তু। অভাবের মাঝেও অর্জিত ক্রেস্ট ও জার্সির স্তূপ যেন তার অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রমাণ। ফুটবল খেলতে গিয়ে অনেক কটূক্তির স্বীকার হয়েছেন বলেও জানান অন্তু।