রাজধানীর ভাটারা থানার পুলিশ হাউজিং-১ এলাকায় পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের একটি তিনতলা বাড়ি রয়েছে। প্রায় সাড়ে ছয় কাঠা জমির ওপর নির্মিত এই বাড়িটি তিনি অনলাইনে ‘এয়ারবিএনবি’ (Airbnb) অ্যাপের মাধ্যমে ভাড়া দিতেন। বাড়িটি একজন পুলিশ কর্মকর্তার হওয়ায় স্থানীয়রা ভয়ে এতদিন এর কর্মকাণ্ড নিয়ে কোনো টু শব্দ করার সাহস পায়নি। অভিযোগ রয়েছে, এই বাড়িতে নিয়মিত ডিজে পার্টি ও অসামাজিক কার্যকলাপ চলত এবং সেখান থেকে আসা আয়ের ৭০ শতাংশ যেত খোদ জহিরের অ্যাকাউন্টে। বাকি ৩০ শতাংশ নিতেন বাড়ির দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা কো-হোস্ট মাহবুব আলম। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ব্যক্তি বাড়িটি ভাড়া নিয়ে কেউ রাত্রিযাপন করতেন, আবার কেউ পার্টি করতেন। বাড়িটি এক পুলিশ কর্মকর্তার হওয়ায় ভয়ে কেউ ওদিকে তাকানোর সাহসও পেত না। অনলাইনে এয়ারবিএনবি অ্যাপের মাধ্যমে ভাড়া দেওয়া ওই বাড়ি থেকে আয়ের ৭০ ভাগ যেত জহিরের অ্যাকাউন্টে, আর বাকিটা নিতেন তার নিয়োগ দেওয়া কো-হোস্ট মাহবুব। পুলিশ কর্মকর্তার বাড়িতে অবাধে অপকর্ম চললেও এতদিন প্রশাসন ছিল নিশ্চুপ, এমন দাবি স্থানীয়দের। এছাড়া ভাটারা থানা এলাকায় তার সাড়ে ছয় কাঠা জমি কেনার টাকার উৎস নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জানা গেছে, এয়ারবিএনবি হলো একটি অনলাইন মার্কেটপ্লেস বা প্ল্যাটফর্ম, যার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে মানুষ তাদের বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, ভিলা বা রুম স্বল্প ও দীর্ঘ সময়ের জন্য পর্যটক বা অতিথিদের কাছে ভাড়া দিতে পারেন এবং অতিথিরা বুকিং করতে পারেন।
গভীর রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উত্তরা বিভাগ বাড়িটিতে অভিযান চালায়। অভিযানে ২৬ জন নারী ও ৫৮ জন পুরুষসহ মোট ৮৪ জনকে আটক করা হয়েছে। ডিবি সূত্রে জানা গেছে, আটকদের মধ্যে একজন আফগানিস্তানের নাগরিক এবং এক পুলিশ কর্মকর্তার দুই মেয়েও রয়েছে। তবে পুলিশি তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম প্রকাশ করা হয়নি। গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির বলেন, ‘পুলিশ হাউজিং-১ এর ওই বাড়িটিতে অসামাজিক কর্মকাণ্ড চলছে—এমন তথ্যের ভিত্তিতে গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে নারী-পুরুষসহ ৮৪ জনকে আটক করা হয়েছে।
অভিযানস্থল থেকে গাঁজা, ইয়াবা, মদ এবং ইয়াবাসেবনের বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যে জানা যায়, বাড়িটিতে মোট পাঁচটি রুম রয়েছে। একেকটি রুম ১০ জন পর্যন্ত ভাড়া নিত এবং অতিরিক্ত লোক থাকলে প্রতিজনের জন্য ৬০০ টাকা রেজিস্ট্রেশন ফি নেওয়া হতো। দুপুর ১২টা থেকে পরের দিন সকাল পর্যন্ত চলা এই আসরগুলোতে প্রতি মাসে প্রায় ১৮ থেকে ২০টি প্রোগ্রাম হতো, যেখান থেকে মোটা অঙ্কের টাকা ভাড়া হিসেবে আসত।
এই ঘটনার পর মঙ্গলবার পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরকে ‘রিপেয়ার অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স’ শাখা থেকে সরিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি জমি কেনা ও আয়ের উৎসের বিষয়েও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তদন্ত শুরু করেছে। তার বিষয়ে খোঁজ নেওয়া শুরু করেছে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাও। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে আব্দুল্লাহ আল জহির দাবি করেন, তিনি অনলাইনে নিয়ম মেনেই বাসাটি ভাড়া দিয়ে থাকেন। তার ভাষ্যমতে, ‘আমি অনলাইনে বাসা ভাড়া দিই এবং সেখানে কিছু কঠোর নিয়মও আছে। কোনো অবৈধ কাজ হলে তার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই, তবে আমি কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে বাড়ি ভাড়া দিই না।’
তিনি আরও বলেন, ‘এবার যারা বাসাটি ভাড়া নিয়েছিল, তারা জন্মদিনের পার্টির কথা বলেছিল। কিন্তু তারা যে সেখানে মাদক আনবে বা এমন কর্মকাণ্ড করবে, তা আমার জানা ছিল না।’