ক্যানসারের কঠিন চিকিৎসায় চুল পড়ে যাওয়াটা স্বাভাবিক, কিন্তু সেই কষ্ট সামিয়াকে একা বইতে দেননি তাঁর পরিবার। ডিম্বাশয় বা ওভারিয়ান ক্যানসারে আক্রান্ত উপস্থাপক সামিয়া আফরিন যখন চুল হারানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন তাঁর বড় ছেলে আহানাফ আরাবি নিজে মায়ের মাথা ন্যাড়া করে দেন এবং নিজেও চুল ফেলে দিয়ে মায়ের পাশে দাঁড়ান। স্বামী এস এম রেজাউল ইমরানও স্ত্রীকে সঙ্গ দিতে নিজের চুল ফেলে দেন। গত ১৫ সেপ্টেম্বর এই মুহূর্তের একটি ভিডিও ফেসবুকে পোস্ট করে সামিয়া জানিয়েছিলেন, সব প্রতিকূলতাকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়াই এখন তাঁর পথ। জীবনের কঠিন এই সময়ের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার বার্তা দিয়েছেন তিনি। একটু পর ছেলেও মাথা ন্যাড়া করে হাজির। তাই নিজের মাথার চুল ফেলে তিনিও দাঁড়ালেন স্ত্রীর পাশে। তাই নিজেকে সেভাবেই প্রস্তুত করছিলেন। প্রথমে চুল ছোট করেন, পরে ছেলে আহানাফ আরাবির হাতে মাথা ন্যাড়া করান। সবকিছু নিয়ে মন খারাপ করে লাভ নেই; সময়ের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারাটাই আসল। বললেন, ‘চুল তো মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্য। চুল থাকুক বা না থাকুক, আত্মবিশ্বাসটাই মূল। ২৭ বছরের দাম্পত্য জীবনে স্বামী রেজাউল ইমরানকে প্রতিটি কঠিন সময়ে পাশে পেয়েছেন। মায়ের অসুস্থতা তাঁর নিজের জীবনেও কীভাবে প্রভাব ফেলে, তা বোঝাতে গিয়ে আহানাফ বলেন, ‘যা-ই করি, মাথায় থাকে মায়ের তো ক্যানসার।’। ক্যাম্পাসে গেলে বন্ধুরা চুল ফেলে দেওয়ার কারণ জানতে চেয়েছে।
সামিয়ার ক্যানসারের লড়াই নতুন নয়। সন্ধ্যায় সেজেগুজে দাওয়াত খেতেও গিয়েছি।
২০২২ সালে তাঁর প্রথম কোলন ক্যানসার ধরা পড়ে।
ওই বছরের এপ্রিল মাসে সিঙ্গাপুরে পরীক্ষার পর জানা যায়, ক্যানসার চতুর্থ পর্যায়ে পৌঁছেছে। চিকিৎসকের পরামর্শে ওই বছরের এপ্রিলে সিঙ্গাপুরে যান তিনি।
সেই সময় অস্ত্রোপচার ও কেমোথেরাপির কথা শুনে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি।
গত ১১ অক্টোবর রাজধানীর বনানীতে নিজের বাসায় সঙ্গে আলাপচারিতায় সামিয়া জানান, সেই সময় খবরটি পাওয়ার পর তিনি এতটাই ভেঙে পড়েছিলেন যে চিকিৎসা না নিয়ে দেশে ফেরার কথাও ভেবেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত ইমিউনোথেরাপির পথ বেছে নেন তিনি। ২১ দিন পরপর দেওয়া এই চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত তীব্র। প্রথম থেরাপির পর তিনি ঢোক গিলতে পারতেন না এবং ত্বকে প্রচণ্ড চুলকানি হতো। সিঙ্গাপুরে যখন গিয়েছিলেন তখন সামিয়া হেঁটে চলতে পারলেও, ফেরার সময় তাঁকে হুইলচেয়ার ব্যবহার করতে হয়েছিল। ২০২৩ সালে দেশে ফেরার পরও নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগেছেন, এমনকি ডায়াপার ব্যবহারের মতো পরিস্থিতিতেও পড়তে হয়েছিল তাঁকে। হাঁটাচলা করতে পারছি, এটাই অনেক বড় পাওয়া। সামিয়া বলেন, ‘চিকিৎসক দেবর যখন প্রথম খবরটা দিল, ভেবেছিলাম, যখন হয়েই গেছে, তখন আর কী করা যাবে। মনে হয়েছিল, চিকিৎসা নিলে আমার পুরো জীবনযাপন বদলে যাবে।’। সিঙ্গাপুরে যাওয়ার সময় হেঁটে চলাফেরা করলেও ফেরার সময় হুইলচেয়ারের প্রয়োজন হয়েছিল। একসময় পাতলা পায়খানার সমস্যায় ডায়াপার পরে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় তাঁকে।
চিকিৎসার মাধ্যমে সামিয়া ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছিলেন। কিন্তু নিয়মিত ফলোআপের সময় জেনেটিক পরীক্ষায় আবারও ক্যানসার ধরা পড়ে। এবার ওভারিয়ান ক্যানসার। গত ২২ জুলাই সিঙ্গাপুরে তাঁর অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয় এবং বর্তমানে দেশে কেমোথেরাপি নিচ্ছেন তিনি। ডিসেম্বর মাসে তাঁর ছয়টি কেমোথেরাপির কোর্স সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। এবারের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, খাবারের স্বাদ ও ঘ্রাণ হারিয়ে ফেলেছেন এবং শারীরিক যন্ত্রণায় মুখ লাল হয়ে যায়। তিনি বলেন, এই কষ্ট কাউকে বুঝিয়ে বলা সম্ভব নয়, যিনি ভুক্তভোগী তিনিই কেবল এর তীব্রতা অনুভব করতে পারেন। এই জেনেটিক ত্রুটির কারণে ভবিষ্যতে শরীরের অন্য কোথাও ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি রয়ে গেছে, তবুও তিনি আশা ছাড়েননি। এবারের চিকিৎসার অভিজ্ঞতা নিয়ে সামিয়া বলেন, ‘খাবারে স্বাদ-গন্ধ কিছুই পাই না। জেনেটিক পরীক্ষায় শরীরে জিনগত ত্রুটি ধরা পড়েছে বলে জানান সামিয়া। যিনি এর মধ্য দিয়ে যাবেন, তিনিই বুঝবেন।’।
সামিয়ার এই লড়াইয়ে তাঁর স্বামী, দুই ছেলে এবং বাবা অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী আবদুর রহিম ও মা জীবন নাহার পরম ভরসা হয়ে আছেন। সামিয়ার বড় ছেলে আহানাফ আরাবি বর্তমানে বিবিএ পড়ছেন। মা অসুস্থ জেনে কানাডায় পড়াশোনা ছেড়ে দেশে ফিরে এসেছিলেন তিনি। মায়ের মনোবল বাড়াতে চুল কাটার বিষয়ে আহানাফ জানান, এটি কেবল মায়ের প্রতি সমর্থন প্রকাশের একটি মাধ্যম। তিনি ক্যাম্পাসেও বন্ধুদের মায়ের অসুস্থতার কথা জানিয়ে নিয়মিত সাপোর্ট পাচ্ছেন। এছাড়া সামিয়া তাঁর ভাইয়ের ছেলে আয়মান আওসাফের আইনি অভিভাবকত্বের দায়িত্ব নিয়েছেন, যে বর্তমানে ও লেভেলে পড়ছে। এর আগে কাছের মানুষ ছাড়া অনেকেই তাঁর অসুস্থতার কথা জানতেন না।
গত বছরের ২০ মার্চ বনানীতে আয়োজিত পোশাক প্রদর্শনী ‘রিভোগ ওয়্যার টু কেয়ার’-এর মাধ্যমে সামিয়া প্রকাশ্যে নিজের ক্যানসারের কথা জানিয়েছিলেন। এরপর থেকে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত নিজের অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেন। তিনি মনে করেন, শারীরিক যন্ত্রণার পাশাপাশি মানসিক চাপ সামলানোই ক্যানসার রোগীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি শুধু রোগের কষ্টের কথা নয়, বরং মানসিকভাবে শক্ত থাকার উপায়গুলোও সবার সামনে তুলে ধরেন। তাঁর ‘পারপাস বাই সামিয়া’ পডকাস্টের মাধ্যমে আক্রান্ত অন্য রোগীদের সাহস জোগানোর চেষ্টা করেন এবং উজ্জ্বলা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে রোগীদের জন্য মেডিক্যাল ক্যাম্প ও তহবিল সংগ্রহের কাজ করেন। পরিবারের অন্যদের কাজ থাকত, আর নিজেরও শক্ত থাকার ইচ্ছা ছিল।
সামিয়া বর্তমানে থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। গত ১৩ অক্টোবর তিনি থাইল্যান্ডে পৌঁছান এবং ২৩ অক্টোবর তাঁর দেশে ফেরার কথা রয়েছে। দেশে ফেরার পর ২৫ অক্টোবর পুনরায় তাঁর কেমোথেরাপি শুরু হবে। চিকিৎসার এই পর্যায়ে তিনি উপস্থাপনা কিংবা অন্য কোনো কাজে মনোযোগ দিচ্ছেন না। পরিবর্তে তিনি গান শোনা, বারান্দার গাছপালার যত্ন নেওয়া এবং নিজের পোষা বিড়ালের সঙ্গে সময় কাটিয়ে মানসিক প্রশান্তি খুঁজে নিচ্ছেন। সামিয়া জানান, তিনি অসুস্থতাকে কখনোই মানসিকভাবে গ্রহণ করতে চান না। বাবা, মা ও স্বামীর সামনে সর্বদা শক্ত থাকার চেষ্টা করেন যাতে তারা ভেঙে না পড়েন। যদিও মেয়ের চিকিৎসার বিপুল ব্যয় নিয়ে চিন্তিত বাবা আবদুর রহিম বলেন, এই কষ্ট তাদের নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখে সবার কাছে শুধু মেয়ের জন্য দোয়া চেয়েছেন। নিজের বাবা ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের কাছ থেকেও শুরু থেকেই সহযোগিতা পাচ্ছেন।