কুমিল্লা নগরের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের যুবদল কর্মী আবু কাউছার (৪৩) নিহতের ঘটনায় তাঁর বড় ভাই কবির হোসেনের দায়ের করা মামলার এজাহারে হামলার বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে। গত শুক্রবার সকালে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার ছত্রখিল পুলিশ ফাঁড়ির কাছে এ হামলার ঘটনা ঘটে। মামলার এজাহারে পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও তিন-চারজনকে আসামি করা হয়েছে। মামলা দায়ের নিয়ে থানায় হট্টগোল: ‘দরকার হইলে আমরা এমপি-মন্ত্রীরে আনামু’। তবে তাঁর ভাইয়ের করা মামলার এজাহারে তৌহিদ, তাঁর ভাই ও বাবাসহ পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে কাউছারকে কোপানো ও ছুরিকাঘাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। এজাহারে কবির হোসেন উল্লেখ করেন, তাঁর ছোট ভাই আবু কাউছার কাপ্তান বাজার এলাকায় তাঁর বন্ধু শামীম হোসেন, হেলাল উদ্দিন ও গোলাম রসুলের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করছিলেন। হামলার প্রস্তুতি আগে থেকেই ছিল, বলছে পুলিশ।
এজাহার অনুযায়ী, মামলার আসামিরা হলেন তৌহিদুল ইসলাম, তাঁর ভাই তানজির আলম, বাবা খোরশেদ আলম, সাইফুল ইসলাম এবং ফরহাদ হোসেন। গত শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কাউছার তাঁর সহযোগীদের নিয়ে অটোরিকশায় করে যাওয়ার সময় আসামিরা পথ রোধ করেন। এরপর চাপাতি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়। এ সময় তাঁকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসা অটোরিকশাচালক মাসুমও গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা এগিয়ে এলে হামলাকারীরা মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়। তাঁরা নির্ধারিত স্থানে পৌঁছালে অটোরিকশার গতি রোধ করেন আসামিরা। পরে আসামিরা আপস-মীমাংসার প্রস্তাব দিয়ে ১৬ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ছত্রখিল পুলিশ ফাঁড়ির পূর্ব পাশে আসতে বলেন। কাউছারকে বাঁচাতে অটোরিকশাচালক মাসুম এগিয়ে গেলে তানজির তাঁর মাথা লক্ষ্য করে রামদা দিয়ে কোপ দেন। এ সময় সাক্ষীরা চিৎকার শুরু করলে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে আসতে থাকেন। তখন আসামিরা আগে থেকে রাখা দুটি মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যান। আগেই দেশীয় অস্ত্র নিয়ে অবস্থান, ঘটনাস্থলে পৌঁছার পরই কাউছারকে কুপিয়ে হত্যা।
ঘটনার নেপথ্যে জমি নিয়ে বিরোধের কথা উল্লেখ করেছেন বাদীর পরিবার। এজাহারে বলা হয়, কাউছারের ব্যবসায়িক অংশীদার শামীম হোসেন গোমতী নদীর চরে ঘাস চাষের জন্য জমি ইজারা নিয়েছিলেন। ওই জমির সামনে আসামিরা জোরপূর্বক কফি হাউস নির্মাণের চেষ্টা করলে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। আপস-মীমাংসার কথা বলে ডেকে নিয়ে কাউছারের ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। কয়েক দিন আগে শামীম গোমতী নদীর উত্তর পাড়ের চরে ৮ থেকে ১০ কানি জমি ইজারা নেন।
তবে ঘটনার কারণ ও জমির মালিকানা নিয়ে ভিন্ন মত দিয়েছে পুলিশ। পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান জানান, প্রাথমিক তদন্তে হত্যাকাণ্ডের পেছনে পূর্বপরিকল্পনার তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া বিরোধের সূত্রপাত হওয়া জমিটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের মালিকানাধীন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। হত্যাকাণ্ডের পর প্রধান অভিযুক্ত তৌহিদ ও তাঁর ভাই তানজিরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জনতার হাতে ধরা পড়লেন মূল অভিযুক্ত, জামায় ছিল রক্তের দাগ।
গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিল পুলিশ। শুনানি শেষে কুমিল্লার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফারহাদ রায়হান ভূঁইয়া তাঁদের সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, প্রধান আসামি তৌহিদের বিরুদ্ধে হত্যাসহ সাতটি মামলা রয়েছে এবং তিনি জামিনে ছিলেন। তানজিরের বিরুদ্ধেও একটি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে, অন্যদের বিরুদ্ধে আরও কোনো মামলা আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার দিন দুপুরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কাউছারের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় রবিবার দুপুরে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলাটি এফআইআর হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়।
কুমিল্লা জেলা পুলিশ ও স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)-১১ এর যৌথ তদন্তে হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্যদের শনাক্তের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। কাউছারের ব্যবসায়িক সহযোগী শামীম, হেলাল উদ্দিন, আমির হোসেন ও রবিনসহ প্রত্যক্ষদর্শীরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। অন্য একটি অটোরিকশায় ছিলেন হেলাল উদ্দিন, আরমান, আবদুল বারেক ও ইসমাইল। কাউছার হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের দাবিতে গত শনিবার সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলন করে কুমিল্লা জেলা পুলিশ ও স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)-১১। হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাঁদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মামলার প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং ঘটনার সাথে জড়িত কাউকেও ছাড় দেওয়া হবে না। এজাহারে উল্লিখিত ফরহাদ হোসেনের সুইচ গিয়ার ছুরি ব্যবহারের বিষয়টিও তদন্তের অধীনে রয়েছে।
তদন্ত সাপেক্ষে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে বলে কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তৌহিদুল আনোয়ার নিশ্চিত করেছেন।