ভারত থেকে বাংলাদেশে সম্প্রতি ঠেলে দেওয়া এক ভারতীয় নারীর অবস্থান নিশ্চিত করতে ও তাঁকে ফিরিয়ে আনতে ভারতের কেন্দ্রীয় এবং আসাম রাজ্য সরকারকে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন গুয়াহাটি হাইকোর্ট। বিচারপতি কল্যাণ রাই সুরানা ও বিচারপতি প্রাঞ্জল দাসের ডিভিশন বেঞ্চ এই কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। মামলার নথিতে দেখা যায়, গত মে মাসে আসামের নগাঁওয়ের চার নম্বর ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল থেকে মমতাজ বেগম নামের এক গৃহবধূকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল। এরপর জুনের মাঝামাঝি সময়ে তাঁকে গোয়ালপাড়ার মাটিয়া আটককেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয় এবং সেখান থেকে সীমান্তে নিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) মাধ্যমে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়।
মমতাজ বেগমের স্বামী স্ত্রীর নিখোঁজ হওয়ার পর আদালতে হেবিয়াস কর্পাস (খুঁজে বের করার) আবেদন করলে পুরো বিষয়টি সামনে আসে।
আইনি প্রক্রিয়ার এই গাফিলতি নিয়ে আদালতে বড় ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ট্রাইব্যুনালের রায়ের অনুলিপি সময়মতো ওই নারীকে দেওয়া হয়নি, যার ফলে তিনি উচ্চতর আদালতে আপিল করার আইনি সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। ঘটনার দিন ট্রাইব্যুনালে আইনজীবীসহ উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও আইনজীবীর অনুপস্থিতির সুযোগে মমতাজকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এছাড়া ট্রাইব্যুনালের মে মাসের রায়ের সারসংক্ষেপ কোন তারিখে তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে একটি প্রশাসনিক তদন্ত শেষ হয়েছে এবং সেই প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়ার বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রশাসনিক নির্দেশে কোনো মানুষকে সীমানার ওপারে পাঠালেও তাঁর জীবনের সুরক্ষা ও অবস্থানের তথ্য সরকারি স্তরে থাকা কতটা জরুরি, তা এই রায়ে পরিষ্কার ফুটে উঠেছে।
এর আগেও ২০১৯ সালে মমতাজ বেগমকে বিদেশি নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করেছিল ট্রাইব্যুনাল, কিন্তু পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালত সেই রায় খারিজ করে নতুন করে পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইনজীবী আদালতে জানিয়েছেন যে, ওই নারীকে খুঁজে বের করার অনুসন্ধান প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। আগামী নভেম্বরের শুনানিতে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের হলফনামার ওপর ভিত্তি করে মামলার পরবর্তী গতিপথ নির্ধারিত হবে। এর আগে ২০১৯ সালেও মমতাজ বেগমকে বিদেশি নাগরিক বলে ঘোষণা করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল।
আদালতের সাম্প্রতিক এই কঠোর অবস্থান মূলত নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক ত্রুটি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোকে চিহ্নিত করছে। সম্প্রতি ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ও বিভিন্ন রাজ্যের আদালত ভারতীয় নাগরিকদের সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর প্রবণতার তীব্র সমালোচনা করেছেন। এর আগে অপর এক ঘটনায় বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো ভারতীয় নাগরিকের স্বামীকে ২ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট। সঠিক আইনি নিয়ম না মেনে কাউকে দেশ থেকে বহিষ্কার করলে যে প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা তৈরি হয়, সেটিই এই মামলার মাধ্যমে আবারও স্পষ্ট হলো। এই মামলার চূড়ান্ত ফলাফলের ওপরই সীমান্তপারের মানবিক পরিস্থিতি ও আইনি সুরক্ষার ভবিষ্যৎ অনেকটা নির্ভর করছে। এ ঘটনা নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়ায় আইনি ধারাবাহিকতা ও মানবাধিকার রক্ষার বিষয়টিকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে।