হান্সি ফ্লিকের অধীনে বার্সেলোনা যেন এক গোল করার কারখানায় পরিণত হয়েছে। লা লিগায় টানা জয়ের ধারা বজায় রেখে প্রথম ৯ ম্যাচেই শতভাগ জয় নিশ্চিত করেছে দলটি। এই নয় ম্যাচে বার্সেলোনা প্রতিপক্ষের জালে গোল দিয়েছে ৩৯টি, যেখানে দ্বিতীয় স্থানে থাকা দলের গোলসংখ্যা মাত্র ১৯টি। রিয়াল বেতিসের মাঠে গত রাতের ৫-২ গোলের জয়টি তাদের এই অপ্রতিরোধ্য যাত্রার সর্বশেষ নিদর্শন। মৌসুমের শুরু থেকেই বার্সেলোনা কেবল জয়ই পাচ্ছে না, বরং দর্শনীয় ফুটবল ও গোলবন্যা দিয়ে ইউরোপের ফুটবলপ্রেমীদের মুগ্ধ করছে। লা লিগায় হ্যাটট্রিক ট্রফির মিশনে নেমে প্রথম ৯ ম্যাচেই শতভাগ জয় বার্সেলোনার। তা-ও যেনতেন জয় নয়, এ সময়ে প্রতিপক্ষের জালে ৩৯ বার বল পাঠিয়েছে তাঁর দল। কাল রাতে বেতিসের মাঠে গিয়ে ফ্লিকের দল জিতেছে ৫–২ গোলে।
চলতি মৌসুমে লিগের ৩৯ গোলের পাশাপাশি চ্যাম্পিয়নস লিগের দুই ম্যাচে তারা করেছে ৯ গোল।
সব মিলিয়ে ১১ ম্যাচেই তাদের গোলসংখ্যা ৪৮। এর অর্থ হলো, প্রতি ম্যাচে তারা গড়ে ৪.৩৬টি করে গোল করছে। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচটি লিগের কোনো দলই এই মুহূর্তে গোলের হিসেবে বার্সেলোনার ধারেকাছে নেই। বায়ার্ন মিউনিখ ১০ ম্যাচে ৩৬ গোল নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে, আর ম্যানচেস্টার সিটি ১১ ম্যাচে ২৮ গোল নিয়ে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে। বার্সেলোনার এই গোলবন্যার আরেকটি বিশেষ দিক হলো, তাদের খেলা ১১টি ম্যাচের মধ্যে ৬টিতেই দলটি অন্তত ৫টি করে গোল করেছে। মৌসুমের সবচেয়ে কম গোল তারা করেছে অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের বিপক্ষে, সেই ম্যাচেও ছিল দুটি গোল। কিন্তু সমর্থকদের মনে থেকে যায় জয়টা কীভাবে এসেছে সেই রেশও। ১০ ম্যাচে ২৯ গোল করে যৌথভাবে তৃতীয় ফ্রেইবুর্গ ও ব্রাইটন। সেভিয়ারও ১১ জন আলাদা গোলদাতা আছেন।
গোল করার ক্ষেত্রে বার্সেলোনার বৈচিত্র্যও আলোচনার জন্ম দিচ্ছে। এখন পর্যন্ত লা লিগায় তাদের হয়ে গোল করেছেন ১১ জন ভিন্ন খেলোয়াড়, যা ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোতে সর্বোচ্চ। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, প্রতিপক্ষ কোনো নির্দিষ্ট ফুটবলারকে আটকে বার্সেলোনাকে থামানোর সুযোগ পাচ্ছে না। ফ্লিক নিজে যদিও এসব রেকর্ডের চেয়ে ট্রফি জয়েই বেশি মনোযোগী, তবে এই গোলক্ষুধা তাদের বড় কিছু অর্জনের পথে এগিয়ে নিচ্ছে। অতীতে ২০১১-১২ মৌসুমে লিওনেল মেসির ৭৩ গোলের বছরে ৬৪ ম্যাচে বার্সেলোনা সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ১৯০টি গোল করেছিল। এবার ১১ ম্যাচেই ৪৮ গোল করে ক্লাব সেই রেকর্ডের পথে চার ভাগের এক ভাগ পথ পাড়ি দিয়ে ফেলেছে। আর সে জায়গাটিতেই বার্সেলোনা এবার অপ্রতিরোধ্য তো বটেই, গোলের ফোয়ারা ছুটিয়ে রীতিমতো বিনোদনদায়ী দলই হয়ে উঠেছে। ইউরোপের বড় লিগগুলোর ইতিহাসে এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলের তালিকায় শীর্ষে তুরিনোর ১৯৪৭–৪৮ মৌসুমের ১২৫ গোল। এরপর রিয়াল মাদ্রিদ ২০১১–১২ মৌসুমে ১২১ এবং ২০১৪–১৫ মৌসুমে ১১৮ গোল করেছিল। শুধু গোলের সংখ্যা নয়, গোলদাতার বৈচিত্র্যও বার্সেলোনার আক্রমণভাগের শক্তির পরিচয় দিচ্ছে। বার্সেলোনার নিজেরও ২০১৬–১৭ মৌসুমে লিগে ১১৬ গোল করার নজির আছে।
তবে বার্সেলোনার আসল পরীক্ষার সময় আসছে এখন। আগামী মঙ্গলবার রাতে চ্যাম্পিয়নস লিগের ম্যাচে গত দুইবারের চ্যাম্পিয়ন পিএসজির মুখোমুখি হবে তারা। এরপর ২৫ অক্টোবর ক্যাম্প ন্যুতে মৌসুমের প্রথম এল ক্লাসিকোতে তাদের প্রতিপক্ষ চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদ। ৫৮ বছর পর রিয়ালের একটি কীর্তি ছুঁয়ে ফেলার মতো অর্জন নিয়ে এগিয়ে চলা এই বার্সেলোনাকে সামনে কে থামাবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। মৌসুমের অনেকটা পথ এখনো বাকি, সামনে কঠিন প্রতিপক্ষও আসবে।
ম্যাচ শেষে গোলবন্যা ও টানা জয় নিয়ে প্রশ্ন করা হলে কোচ ফ্লিক অবশ্য বেশ নির্লিপ্তই ছিলেন। তিনি বলেন, লক্ষ্যটা বড় কিছু জয় করা এবং দিনশেষে ট্রফি ঘরে তোলা। ফুটবল মূলত ট্রফি জেতার জন্যই খেলা হয় এবং তার দল সেই লক্ষ্যেই অটল। এখন দেখার বিষয়, মাঠের এই দাপুটে ফর্ম ধরে রেখে বার্সেলোনা মৌসুম শেষে নিজেদের ঝুলিতে কয়টি শিরোপা জমা করতে পারে। এমন গোলবন্যা আর টানা জয় নিয়ে ম্যাচ শেষে জিজ্ঞেস করা হলে বার্সেলোনা কোচের জবাবে ছিল প্রায় নির্লিপ্ত ভাব, ‘ভালো।