অবৈধ হ্যান্ডসেট ঠেকাতে তৃতীয়বারের মতো ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি। আগামী বছরের ১ জানুয়ারি থেকে দুই ধাপে এই কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সরকারি নথিপত্র ও সংশ্লিষ্টদের মতে, বাজারের বর্তমান অস্থিরতা এবং বৈধ ফোনের উচ্চমূল্য না কমিয়ে এই ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর করা কঠিন হতে পারে। বিটিআরসি ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি সব ফিচারসহ এনইআইআর চালুর প্রস্তুতি নিয়েছিল।

এনইআইআর হলো একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার, যার মাধ্যমে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ফোনের আইএমইআই নম্বর যাচাই করা হয়। এর ফলে চুরি যাওয়া বা অবৈধ পথে আসা হ্যান্ডসেট নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব। ২০২১ সালের ১ জুলাই পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম এটি চালু করা হলেও নানা সীমাবদ্ধতায় তা পূর্ণতা পায়নি। বর্তমানে ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স (এনএসআই) দেশের অর্থনীতি ও জননিরাপত্তার স্বার্থে এটি দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছে। গত ২২ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। এরপর ২ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সভায় এবং ২২ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে আলোচনা হয়।

বিটিআরসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে কেবল বৈধভাবে উৎপাদিত বা আমদানিকৃত ফোন শনাক্ত করা হবে, যেখানে কোনো ফোন বন্ধ বা ডি-রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা থাকবে না। দ্বিতীয় ধাপে ডি-রেজিস্ট্রেশন বা হ্যান্ডসেট ব্যবহারের সুযোগ সীমিত করার কঠোর ব্যবস্থা যুক্ত হতে পারে। তবে এই উদ্যোগ নিয়ে সরকার তাড়াহুড়ো করতে চায় না। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) একত্রে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে চায়, যাতে ক্রেতাদের ওপর বিরূপ প্রভাব না পড়ে। তবে এতে বছর বছর রাজস্ব হারায় সরকার। তবে পরে অবৈধভাবে আমদানি করা ফোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ করা এবং ক্লোন হ্যান্ডসেট শনাক্ত করে ব্যবহারে বাধা দেওয়ার ফিচার বাদ রাখা হয়। পরে অবৈধ ফোনসেটের কারণে বছরে দুই হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে উল্লেখ করে ২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবর এনইআইআর পুরোপুরি চালুর উদ্যোগ নিতে বিটিআরসিকে চিঠি দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ২০২৫ সালের ২৮ জুন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এ বিষয়ে অনুমোদন দেয়। তবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অনানুষ্ঠানিকভাবে মুঠোফোন বিক্রেতাদের বিক্ষোভের পর জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে অবৈধ ফোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ করার ফিচার ছাড়াই ব্যবস্থা চালু রাখা হয়। বিটিআরসির নথিপত্র বলছে, চলতি বছরের ৯ জুন অর্থনীতি ও জননিরাপত্তার বিষয় উল্লেখ করে এনইআইআর পুরোপুরি চালুর বিষয়ে বিটিআরসিকে চিঠি দেয় জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই)। এই কার্যক্রমের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক ব্যবসায়ী যুক্ত রয়েছেন। এক দশকে দেশে মুঠোফোন সংযোজন ও উৎপাদনশিল্প গড়ে উঠেছে। স্থানীয় কারখানাগুলো মূলত নিম্ন ও মধ্যম দামের ফোন সংযোজন করে থাকে। জটিল সরবরাহব্যবস্থা, বিশেষায়িত যন্ত্রাংশ এবং সীমিত বাজার চাহিদা এর অন্যতম কারণ।

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই ব্যবস্থা জরুরি। তবে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, অবৈধ সেট বন্ধের আগে বৈধ হ্যান্ডসেটের দাম জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকা প্রয়োজন। সুলভ মূল্যে বৈধ সেট নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই বর্তমানে উৎপাদনকারীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। গ্রাহকেরা তাই দাম বৃদ্ধির খড়্গ এড়াতে এমন ফোনে ঝুঁকছে। একটি বৈধ ফোনসেট কিনে সেটি গ্রাহক যতটা মেয়াদে ব্যবহার করতে পারেন, আনঅফিশিয়াল ফোনে সেই মেয়াদ তাঁরা পাচ্ছেন না।

বাজারে বৈধ ফোনের উচ্চমূল্য বর্তমানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। চলতি বছরের শুরুতে সরকার আমদানি শুল্ক কমানোর উদ্যোগ নিলেও এর সুফল বাজারে মেলেনি। উল্টো বৈশ্বিক বাজারে মেমোরি চিপের সংকট ও সরবরাহ শৃঙ্খলে জটিলতার কথা বলে ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন ব্র্যান্ডের স্মার্টফোনের দাম ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছেন। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দামের যে চিত্র দেখা গেছে, তাতে ১৩ হাজার টাকার সেট বেড়ে ১৮ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। বছরের শেষ নাগাদ এই দাম ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে উৎপাদকদের আশঙ্কা। শুল্ক কমলেও মুঠোফোনের দাম কি আদৌ কমবে। নিজের মুঠোফোনের ফাঁস হওয়া তথ্য দেখে মন্ত্রী বললেন, এটা কীভাবে সম্ভব।

স্যামসাংয়ের নির্বাহী পরিচালক সাইফুদ্দিন টিপু জানিয়েছেন, মেমোরি চিপের বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটের কারণে উৎপাদন খরচ ক্রমাগত বাড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে স্থানীয় বাজারে। অন্যদিকে, অনেক ক্রেতা দামি অফিশিয়াল সেট ছেড়ে কম দামের আনঅফিশিয়াল সেটের দিকে ঝুঁকছেন। স্থানীয় উৎপাদকদের দাবি, বাজারে থাকা আনঅফিশিয়াল ফোনের অন্তত ৭৫ শতাংশই রিফার্বিশড বা সেকেন্ডহ্যান্ড, যা দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহারকারীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তুলনামূলক কম দামের কারণে অনানুষ্ঠানিকভাবে দেশে আসা ফোনসেটের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি। তবে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অ্যাপল, গুগল, হুয়াওয়ে, মটোরোলা, স্যামসাং ও শাওমির অনেক প্রিমিয়াম মডেল স্থানীয়ভাবে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করা সম্ভব নয়। বিশ্বে অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠান মেমোরি চিপ উৎপাদন করে। আনঅফিশিয়াল মুঠোফোনের সবচেয়ে বড় সুবিধা সেটি অফিশিয়াল সেটের চেয়ে বেশ খানিকটা কমদামে পাওয়া যায়। ফলে সল্পমেয়াদে সুবিধা পেতে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন মনে করেন, এনইআইআর বাস্তবায়ন করতে হলে ফোনের দাম নিয়ন্ত্রণ করা অপরিহার্য। তিনি বলেন, ক্যামেরা, ব্যাটারি ও ডিসপ্লে প্যানেলের মতো যন্ত্রাংশের আমদানি শুল্ক কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন খরচ কমানো সম্ভব। ফোনের দাম হাতের নাগালে না এলে ক্রেতারা অবৈধ চ্যানেলের দিকেই ঝুঁকবেন এবং এনইআইআর ব্যবস্থা কার্যকর করা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। ক্যামেরা, ডিসপ্লে প্যানেল, ব্যাটারিসহ ইত্যাদি বিভিন্ন খুচরা যন্ত্রাংশের আমদানি শুল্ক কমাতে পারলে দেশীয় বাজারে তৈরি হওয়া সেটের দাম বাজেটের মধ্যে থাকতে পারে। দাম নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে, আনঅফিশিয়াল চ্যানেলে সেট বিক্রি অনুৎসাহিত করা, এমনকি এনইআইআর বাস্তবায়নও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যেতে পারে।