যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে পাঁচজন সরকারি কর্মচারীসহ মোট সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। গত তিন দিন ধরে ঢাকা ও এর বাইরে ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে তাঁদের আটক করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বেশ কয়েকজন কর্মী ছাড়াও বন ও পরিবেশ অধিদপ্তর এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মচারীও রয়েছেন। শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফিন।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ১০ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের ২৪২টি শূন্য পদে নিয়োগের জন্য বাছাই পরীক্ষা নির্ধারিত ছিল। এই পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল ৩ লাখ ১৯ হাজার চাকরিপ্রার্থীর। তবে পরীক্ষার দিন সকাল ১০টা ৩ মিনিটে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা স্থগিত করে। ওই দিনই যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে মতিঝিল থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। এরপর এসআরবির গোয়েন্দা দল প্রশ্ন ফাঁসের মূল উৎস, সরবরাহকারী ও মধ্যবর্তী চক্রের সদস্যদের চিহ্নিত করতে ছায়া তদন্ত শুরু করে এবং ১৪, ১৫ ও ১৬ অক্টোবর ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করে। ওই ঘটনায় ১১ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে মতিঝিল থানায় মামলা করা হয়।

তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ অক্টোবর ভোর ৪টা ৪৪৩ মিনিটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদের মুঠোফোনে প্রশ্নপত্রের একটি অস্পষ্ট ছবি আসে। এর পৌনে দুই ঘণ্টা পর সকাল সোয়া ৬টার দিকে একই প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর তাঁকে ওই প্রশ্নপত্রের আরও স্পষ্ট ছবি পাঠান। এরপর নূর মোহাম্মদ প্রশ্নটির উত্তর তৈরি করে জাহাঙ্গীর ও তার সহকর্মী এস এম ইমদাদুল ইসলামের কাছে পাঠান। পরবর্তী সময়ে চক্রের অন্য সদস্যরা নিজেদের পরিচিত প্রার্থী ও প্রশ্নপত্র গ্রাহকদের কাছে সেসব উত্তরপত্র ছড়িয়ে দেন। হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে এই চক্রটি যোগাযোগ ও আর্থিক লেনদেন করত। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, চক্রের সদস্যরা তৃতীয় শ্রেণির নিয়োগ পরীক্ষায় ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা এবং দ্বিতীয় শ্রেণির পরীক্ষার প্রশ্ন ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকায় বিক্রি করতেন। তবে এনবিআরের ওই দুই কর্মী কার কাছ থেকে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন, সে বিষয়ে তাঁরা এখনো কোনো সদুত্তর দেননি। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কেউ এই চক্রের সঙ্গে জড়িত কি না, তা তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানানো হয়। ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে মুঠোফোনে প্রশ্নপত্রের একটি অস্পষ্ট ছবি আসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদের কাছে।

গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ (৩০), কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর (৩৮), কম্পিউটার অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম (৩৫), প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলাম (৩৩), পরিবেশ অধিদপ্তরের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর মো. রুবেল ইসলাম (৩৩), এবং চক্রের অন্য দুই সদস্য মফিজুল ইসলাম (২৩) ও মো. হাসিনুর রহমান ওরফে সুজন। এর আগে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মী রুবেল ইসলামকে মতিঝিল এলাকা থেকে অর্থ লেনদেনের সময় প্রথমে গ্রেপ্তার করা হয়। মফিজুল ইসলাম নামের এক চাকরিপ্রার্থী চক্রটিকে ১৭ লাখ টাকা দিয়ে প্রতারিত হওয়ার পর লাভের আশায় নিজেই তাদের সঙ্গে যুক্ত হন। পরে তাঁদের দেওয়া তথ্য ও মুঠোফোনের চ্যাট বিশ্লেষণ করে উত্তরখান এলাকা থেকে ইমদাদুল ইসলামকে এবং মিরপুর ১০ নম্বর এলাকা থেকে আসাদুল ইসলামকে আটক করা হয়। পরবর্তীতে তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সাভার ও মোহাম্মদপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে নূর মোহাম্মদ ও জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করে এসআরবির বিভিন্ন দল। এরপর মুঠোফোনের চ্যাটের তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল বৃহস্পতিবার সাভার এলাকা থেকে এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদকে গ্রেপ্তার করে এসআরবি-৪।

অভিযুক্তদের কাছ থেকে উদ্ধার করা আলামতের মধ্যে রয়েছে ১০০ টাকার ১১৬টি স্ট্যাম্প, ৫০ টাকার ৪টি স্ট্যাম্প, এক সেট প্রশ্নপত্র, বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্রের ১৯ পাতা, বিভিন্ন ক্যাটাগরির ১০টি সনদ, বিভিন্ন শ্রেণির আরও ১৫টি সনদ, বিভিন্ন ব্যাংকের চেকের ৪৮ পাতা, একটি চেকবই, ছয়টি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং নগদ চার হাজার টাকা। এর আগে গত শনিবার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনার প্রতিবাদে পরীক্ষার্থীরা ঢাকার বিভিন্ন সড়কে নেমে বিক্ষোভ করেছিলেন। ওই দিনই যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আগেই শুক্রবার এই নিয়োগ পরীক্ষা পুনরায় সম্পন্ন হয়েছে।