বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী সাময়িকী ফোর্বস প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ৪০০ ধনী ব্যক্তির যে তালিকা প্রকাশ করে, তা ‘ফোর্বস ফোর হান্ড্রেড’ হিসেবে পরিচিত। বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার এই তালিকায় একটি বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৫ সালে তালিকায় ৪০ বছরের কম বয়সী বিলিয়নেয়ারের সংখ্যা ছিল চারজন, যা ২০২৬ সালে বেড়ে ১০ জনে দাঁড়িয়েছে। এই ১০ জনের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১৬৯ বিলিয়ন ডলার, যার হিসাব করা হয়েছে ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের বাজারমূল্যের ওপর ভিত্তি করে। এই তরুণদের মধ্যে সাতজনেরই বিশাল সম্পদের উৎস কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি, যা সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিংবা ডেটা ট্রেনিংয়ের মতো খাতে বিপ্লব ঘটিয়েছে। তাঁদের মধ্যে সাতজন নতুন করে তালিকায় জায়গা পেয়েছেন। সম্পদের এই হিসাব করা হয়েছে ২০২৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বরের মূল্যায়ন অনুযায়ী। বয়সের ভিত্তিতে সবচেয়ে বেশি থেকে কম ক্রমে তাঁদের পরিচয় জেনে নেওয়া যাক। ২০২৬ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের পেশাদার বাস্কেটবল দল শিকাগো বুলসের কিছু সংখ্যক মালিকানাও কিনেছেন তিনি। রবিনহুডের দ্রুত বাড়তে থাকা ব্যবসাগুলোর একটি হলো ভবিষ্যৎ ঘটনা নিয়ে বাজি ধরার বাজার, যা ‘প্রেডিকশন মার্কেট’ নামে পরিচিত। এখানে ব্যবহারকারীরা নির্বাচনের ফলাফল, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হারসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, খেলাধুলার ফলাফল কিংবা আবহাওয়া কেমন হবে এসব বিষয়ে অর্থের বিনিময়ে চুক্তি কেনাবেচা করতে পারেন। পাশাপাশি ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত গণিতভিত্তিক যুক্তি নিয়ে কাজ করা এআই প্রতিষ্ঠান হারমোনিকের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ২০২১ সালে ওপেনএআই ছেড়ে ছয় সহকর্মীর সঙ্গে অ্যানথ্রপিক প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান্তা ক্রুজ থেকে পড়াশোনা শেষ করে অর্থ লেনদেনের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্ট্রাইপে কাজ করেন তিনি। এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দিতে প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ তথ্য। এবছর সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১০। কোম্পানিটির প্রায় ৭৫ শতাংশ মালিকানা চেনের হাতে। পরে ২০১৫ সালে স্যাম অল্টম্যান ও ইলন মাস্কসহ অন্যদের সঙ্গে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ওপেনএআই গড়ে তোলেন। ২০২৬ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠানটিকে সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার ও সংশ্লিষ্ট সেবার জন্য সর্বোচ্চ ২০ বিলিয়ন ডলারের ১০ বছর মেয়াদি চুক্তি দেয়।
১০. লুকাস ওয়ালটন
- বয়স: ৩৯ বছর
- সম্পদ: ৪৪.৪ বিলিয়ন ডলার
- পরিচিতি: শিকাগোভিত্তিক বিল্ডার্স ভিশনের মাধ্যমে তিনি টেকসই জ্বালানি, খাদ্যব্যবস্থা ও সমুদ্র সংরক্ষণে বিনিয়োগ করেন। তিনি এনবিএ দল শিকাগো বুলসের আংশিক মালিকানারও অংশীদার।
৯. ভ্লাদ তেনেভ
- বয়স: ৩৮ বছর
- সম্পদ: ৭.১ বিলিয়ন ডলার
- পরিচিতি: রবিনহুডের প্রেডিকশন মার্কেটের পাশাপাশি তিনি হারমোনিক নামক এআই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
৮. টম ব্রাউন
- বয়স: ৩০-এর কোঠায়
- সম্পদ: ১৫.৫ বিলিয়ন ডলার
- পরিচিতি: ওপেনএআইয়ের প্রারম্ভিক ২০ কর্মীর একজন ব্রাউন জিপিটি-৩ গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক। তিনি বর্তমানে অ্যানথ্রপিকের এআই চ্যাটবট ক্লডের প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের তদারকিতে যুক্ত।
৭. ড্যানিয়েলা আমোদেই
- বয়স: ৩৮ বছর
- সম্পদ: ১৮ বিলিয়ন ডলার
- পরিচিতি: স্ট্রাইপ ও ওপেনএআইয়ের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ড্যানিয়েলা বর্তমানে অ্যানথ্রপিকের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে পরিচালনা পর্ষদ ও পণ্য উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ করছেন।
৬. এডউইন চেন
- বয়স: ৩৫ বছর
- সম্পদ: ১৮ বিলিয়ন ডলার
- পরিচিতি: সার্জ এআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা চেন গুগল, ফেসবুক ও টুইটারে কাজের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। কোম্পানিটি কোনো ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ছাড়াই এআই মডেল প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বার্ষিক এক বিলিয়ন ডলার আয় করছে।
৫. গ্রেগ ব্রকম্যান
- বয়স: ৩৫ বছর
- সম্পদ: ২৫.৫ বিলিয়ন ডলার
- পরিচিতি: ওপেনএআইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সিটিও ব্রকম্যান স্ট্রাইপের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা হিসেবেও কাজ করেছেন।
৪. জ্যাক ক্লার্ক
- বয়স: ৩৮ বছর
- পরিচিতি: সাংবাদিকতা থেকে এআই উদ্যোক্তা হওয়া ক্লার্ক বর্তমানে অ্যানথ্রপিকের গবেষণাকেন্দ্রের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং সরকারি পর্যায়ে এআই নীতিমালার পক্ষে সক্রিয়।
৩. স্যাম ম্যাকক্যান্ডলিশ
- বয়স: ৩৭ বছর
- সম্পদ: ২৫.৫ বিলিয়ন ডলার
- পরিচিতি: তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী ম্যাকক্যান্ডলিশ ওপেনএআই থেকে অ্যানথ্রপিকে যোগ দিয়ে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান স্থপতি হিসেবে কাজ করছেন।
২. পামার লাকি
- বয়স: ৩৩ বছর
- সম্পদ: ৫.৯ বিলিয়ন ডলার
- পরিচিতি: আন্দুরিল ইন্ডাস্ট্রিজের প্রতিষ্ঠাতা লাকি স্বয়ংক্রিয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি তৈরি করছেন। তার প্রতিষ্ঠান মার্কিন সেনাবাহিনীর সাথে বড় অংকের চুক্তিতে আবদ্ধ।
১. স্টিভেন হাও
- বয়স: ৩০ বছর
- সম্পদ: ৫.৮ বিলিয়ন ডলার
- পরিচিতি: কগনিশনের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সিটিও হাও এআই এজেন্ট ‘ডেভিন’ তৈরি করেছেন। তিনি আন্তর্জাতিক ইনফরমেটিকস অলিম্পিয়াডের স্বর্ণপদক বিজয়ী এবং স্কেল এআইয়ে প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেছেন।
এআই খাতে এই তরুণদের উত্থান নতুন প্রজন্মের জন্য সম্পদ অর্জনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। যদিও ওয়ালটনের মতো উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পদপ্রাপ্ত উদ্যোক্তারা রয়েছেন, তবুও তালিকার সিংহভাগ তরুণই প্রযুক্তির নতুন ধারায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কেউ সফটওয়্যার মডেলে, কেউ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে, আবার কেউবা আর্থিক প্রযুক্তি খাতের মাধ্যমে তাদের অবস্থান শক্ত করেছেন। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও জ্ঞানীয় বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেছেন টম ব্রাউন। ২০২০ সালে জিপিটি-৩ নামের ভাষাভিত্তিক এআই মডেল নিয়ে প্রকাশিত গবেষণাপত্রের প্রধান লেখকও ছিলেন ব্রাউন। মানুষের মতো সাবলীল ভাষায় লিখতে সক্ষম এই মডেল এআই খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ বাড়াতে ভূমিকা রাখে। পরে ওপেনএআইয়ে নিরাপত্তা ও নীতিবিষয়ক কার্যক্রমের দায়িত্বে ছিলেন। এআই প্রযুক্তির সামাজিক প্রভাব নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি প্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিয়মিত লেখালেখিও করেন। পরে ওপেনএআইয়ে কাজ করার সময় এআই মডেলের সক্ষমতা কীভাবে বাড়ে, তা নিয়ে গবেষণা করেন।