প্রখ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেত্রী নাসিমা খান ৮২ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। মৃত্যুর পর তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবনের নানা সফলতার পাশাপাশি সংগ্রামের গল্পগুলো নতুন করে উঠে আসছে। বিশেষ করে ১৯৬৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘কার বউ’ চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের সময় তাঁর সঙ্গে ঘটা এক অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার স্মৃতি এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে ফিরছে। সেসব স্মৃতির মধ্যেই রয়েছে ‘কার বউ’ ছবির শুটিংয়ের এ ঘটনা। এমনই এক পরিস্থিতি থেকে তৈরি হয় ছবির নানা হাস্যরসাত্মক ঘটনা।
সেই সময় ‘কার বউ’ ছবির চিত্রধারণের জন্য একটি ঝুঁকিপূর্ণ দৃশ্য চিত্রায়িত হচ্ছিল। দৃশ্যটি ছিল এমন—বিয়ের পর স্বামী সড়ক দুর্ঘটনায় পড়েছেন শুনে নববধূ চিৎকার করতে করতে সিঁড়ির দিকে দৌড় দেবেন। পরিচালক নজরুল ইসলাম ওই দৃশ্যটি নিখুঁত করতে আগাম কোনো ঘোষণা ছাড়াই পেছন থেকে নাসিমা খানকে জোরে ধাক্কা দেন। এতে ভারসাম্য হারিয়ে নায়িকা সিঁড়ি থেকে গড়িয়ে নিচে পড়ে যান এবং প্রচণ্ড আঘাত পান। এই আঘাতের ফলে তিনি টানা তিন দিন অসুস্থ ছিলেন, নড়াচড়া করতেও কষ্ট হতো। পরে জানা যায়, ১২ থেকে ১৪ বার চেষ্টার পর পরিচালক ওই দৃশ্যটি ধারণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। স্বামী একজন অতিথিকে গাড়িতে করে পৌঁছে দিতে গেছেন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই গড়িয়ে পড়লেন নিচে। অথচ দৃশ্যটি ধারণের আগে তাঁকে জানানো হয়নি যে সত্যিই এভাবে ধাক্কা দেওয়া হবে। নাসিমা খানের ভাষায়, ‘কার বউ’ ছিল বাংলাদেশের প্রথম দিককার হাসির চলচ্চিত্রগুলোর একটি।
নাসিমা খান ১৯৯০ সালে ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’র ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত নিজের আত্মকথনে এই ঘটনার বিবরণ দিয়েছিলেন। তবে এত বড় দুর্ঘটনার পরও তিনি পরিচালক নজরুল ইসলামের ওপর কোনো ক্ষোভ প্রকাশ করেননি। বরং নজু ভাই হিসেবে পরিচিত সেই পরিচালকের সঙ্গে তাঁর গভীর আন্তরিকতা ও সেই সময়ের চলচ্চিত্রাঙ্গনের পারিবারিক আবহ নিয়ে কথা বলেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, তখনকার দিনে শিল্পীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও আন্তরিকতা ছিল বর্তমানের চেয়ে বেশি।
১৯৪৪ সালের ৬ আগস্ট পুরান ঢাকার লালবাগে জন্ম নেওয়া নাসিমা খানের অভিনয়ের হাতেখড়ি শৈশবেই। মাত্র ১২ বছর বয়সে এ জে কারদার পরিচালিত ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দায় তাঁর যাত্রা শুরু হয়। সংস্কৃতিমনস্ক যৌথ পরিবারে বেড়ে ওঠা নাসিমা নাচ ও অভিনয়ের প্রতি ছোটবেলা থেকেই আগ্রহী ছিলেন। তবে অভিনয় শুরুর ক্ষেত্রে পরিবারের শুরুতে আপত্তি থাকলেও বড় চাচার সমর্থনে তিনি বড় হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।
১৯৬২ সালে সালাহউদ্দিন পরিচালিত ‘সূর্যস্নান’ চলচ্চিত্রে কাজ করতে গিয়েও তিনি বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন। দ্বিতীয় নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করার সময় একটি নির্দিষ্ট দৃশ্য ফুটিয়ে তুলতে পরিচালককে ১২ থেকে ১৪ বার টেক নিতে হয়েছিল। তবে সেই ছবির সাফল্য তাঁর মনে অভিনয়ের প্রতি আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলে। ১৯৭৯ সালে তিনি টেলিভিশনে উপস্থাপনার মাধ্যমে আবারও ক্যামেরার সামনে ফিরেছিলেন।
নাসিমা খানের জীবনের শেষ সময়টা অবশ্য কাটছিল গভীর উদ্বেগে। ১৯৭৫ সালে তিনি চলচ্চিত্রজগতের বাইরের একজনকে বিয়ে করেছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি ঢাকার আশুলিয়ার পাথালিয়া ইউনিয়নের নিরিবিলি স্বপ্নবিলাস এলাকায় বসবাস করতেন। তাঁর বড় ছেলে শাবাব নাসিম রহমান যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। তবে ছোট ছেলে নাবিল নাছির রহমান কুশল গত ১১ ফেব্রুয়ারি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর নিখোঁজ হন। নিখোঁজ ছেলেকে খুঁজে পেতে তিনি সংবাদমাধ্যমের কাছে আকুতি জানিয়েছিলেন। হারুন, গোলাম মুস্তাফা, সুভাষ দত্তসহ একাধিক অভিনেতা অভিনয় করেছিলেন তাঁর বিপরীতে।
সবশেষে, ১১ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮২ বছর বয়সে তিনি মারা যান। চলচ্চিত্র সমালোচক মাহমুদা চৌধুরীর অনুলিখনে প্রকাশিত তাঁর সেই আত্মকথন আজও বাংলা চলচ্চিত্র ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে আছে।