মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে সৌদি আরব নিজেকে বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগ, পর্যটন এবং বড় বড় ক্রীড়া ইভেন্টের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছিল। দেশটির যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী রূপান্তর পরিকল্পনায় ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ এখন সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ ১১ বছর ধরে সামরিক শক্তি ও কূটনৈতিক কৌশলের সমন্বয়ে সীমান্ত সংঘাত নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেও, সাম্প্রতিক গ্রীষ্মে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। গত কয়েক বছরের তুলনামূলক শান্ত অবস্থা ভেঙে চলতি গ্রীষ্মে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে এবং গত মাসে তা তীব্র রূপ নিয়েছে। এ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে রিয়াদ প্রথমে ইরানের মিত্র হুতি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে, পরে তাদের সঙ্গে শান্তি আলোচনা চালায় এবং হুতিদের মূল পৃষ্ঠপোষক ইরানের সঙ্গেও কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করে।
চলতি সপ্তাহে সৌদি আরবের কয়েকটি বিমানবন্দরে হুতি বাহিনীর ভয়াবহ হামলায় একজন পাইলটসহ অন্তত তিনজন প্রাণ হারিয়েছেন। এই সংঘাত এখন দেশটির বিভিন্ন শহরের নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলেছে। সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি সিএনএনকে জানান, রিয়াদ বরাবরই চেয়েছিল ইয়েমেনের সংঘাত তাদের থেকে দূরে থাকুক, যাতে দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত না হয়। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, পালটা জবাব দেওয়া ছাড়া সৌদি আরবের সামনে আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই।
এই নতুন অস্থিরতার পেছনে আঞ্চলিক জোট ভাঙন একটি বড় ভূমিকা রেখেছে। গত বছর সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক বেশ টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যায়, যা তাদের দীর্ঘদিনের জোটকে দুর্বল করে ফেলে। বিশেষ করে ইয়েমেনে মোতায়েন করা আমিরাতি সেনাদের দ্রুত প্রত্যাহার এবং পরবর্তীতে ক্ষমতার শূন্যতা পূরণে সৌদি আরবের ব্যর্থতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দক্ষিণ ইয়েমেনের এক কর্মকর্তা জানান, আমিরাতি বাহিনী চলে যাওয়ার সময় দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি ছিল ত্রুটিপূর্ণ, যার মাশুল এখন অঞ্চলবাসীকে দিতে হচ্ছে। ইয়েমেনের একটি প্রতিদ্বন্দ্বী সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দেওয়ার জের ধরে গত বছরের শেষের দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সঙ্গে সৌদি আরব তাদের দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বের অবসান ঘটায়।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইয়েমেন–বিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাগি মনে করেন, সৌদি আরব ধারাবাহিকভাবে কিছু ভুল হিসাব করেছে। হুতিদের প্রতিহত করার পরিবর্তে মিত্র বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়ার কারণে অঞ্চলগুলো হাতছাড়া হয়েছে। নাগির মতে, হুতিদের হাতে এখন আগের চেয়ে অনেক উন্নত অস্ত্র রয়েছে, যা সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, সৌদি আরবের তেল অবকাঠামোয় হামলার ফলে রপ্তানি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি তেলের দামও অস্থির হয়ে উঠেছে। ইয়েমেনে সৌদি আরবের নতুন করে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে রয়েছে একের পর এক ভুল হিসাব। তবে তাঁর সেই আকাঙ্ক্ষায় এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইয়েমেন থেকে ইরান–সমর্থিত হুতিদের ছোড়া ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি উল্লেখ করেন যে, সৌদি আরব তাদের পুরো নিরাপত্তা দর্শন মার্কিন অংশীদারত্বের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তুলেছিল, কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের অপ্রত্যাশিত অবস্থান এখন রিয়াদকে অনিশ্চয়তায় ফেলেছে। যদিও গোয়েন্দা ও সামরিক সহায়তার জন্য বর্তমানে ১০০ জনের বেশি মার্কিন সামরিক উপদেষ্টা সৌদি আরবে কাজ করছেন, তবুও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাইরের সাহায্য ইয়েমেন সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান দিতে পারবে না।
ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট অব পিসের ইয়েমেন–বিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিশাম আল-ওমাইসি বলছেন, রিয়াদের উচিত তাদের সামরিক কমান্ড সেন্টারগুলো সুসংহত করা এবং জোটের ভেতরে থাকা বিভিন্ন উপদলের মধ্যকার বিরোধ মিটিয়ে ফেলা। এছাড়া ইরানের সঙ্গে মার্কিন ও ইসরায়েলি উত্তেজনার ফলে সৌদি আরব সরাসরি ইরানি লক্ষ্যের আওতাভুক্ত হয়ে পড়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করেছে।
সব মিলিয়ে, ইয়েমেনের ‘ইয়েমেন্স ডন’ অভিযানের মাধ্যমে সৌদি আরব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করলেও, বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই সংঘাতের কোনো সামরিক সমাধান নিকট ভবিষ্যতে দেখা যাচ্ছে না। বর্তমানে রিয়াদকে একদিকে যেমন হুতিদের শক্তিশালী আক্রমণের মোকাবিলা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি মার্কিন প্রশাসনের অনিশ্চিত সিদ্ধান্তের সাথেও সমন্বয় করতে হচ্ছে, যা যুবরাজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে এক গভীর সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। কমবেশি সামরিক সাফল্য এলেও সৌদির বিভক্ত মিত্রবাহিনী ও রাজনৈতিক সমাধানের অভাবে এ সংঘাতের শেষ কোথায়, তা এখনো অনিশ্চিত।