জাহাঙ্গীর হোসেন-জেলা প্রতিনিধি (পাবনা), ১১ অক্টোবর ২০২৬ইং ২০২৬ইং (ঢাকা টিভি রিপোর্ট): পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হয়েছে। রবিবার বেলা ৩টা ৩৪ মিনিটে নিয়ন্ত্রিত এ বিক্রিয়া শুরু হয়। এর মধ্য দিয়ে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের আরও কাছাকাছি পৌঁছেছে।

কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে আগামী ডিসেম্বরে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এর আগে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাই ও ধাপে ধাপে উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানোর কাজ শেষ করতে হবে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্র জানায়, সেপ্টেম্বরে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর পরিকল্পনা থাকলেও নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষায় ত্রুটি ধরা পড়ায় তা পিছিয়ে যায়। গত সপ্তাহে উচ্চ চাপে দুই দফায় ভালভের পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। পরীক্ষার ফলাফল যাচাই করে গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বিক্রিয়া শুরুর অনুমোদন দেয়।

নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহেদুল হাছান বলেন, তিন দিনের প্রস্তুতির পর শনিবার পারমাণবিক বিক্রিয়ার চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়। আজ সফলভাবে নিয়ন্ত্রিত বিক্রিয়া শুরু হয়েছে। তার ভাষায়, ১৯৬১ সালে শুরু হওয়া পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের দীর্ঘ যাত্রায় এটি একটি বড় মাইলফলক।

কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটের চুল্লিপাত্র প্রথমবারের মতো ‘ক্রিটিক্যালিটি’ অর্জন করেছে। অর্থাৎ, চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক শৃঙ্খল বিক্রিয়া বজায় রাখার অবস্থা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্রিটিক্যালিটি অর্জনের পর চুল্লিপাত্রের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠিগুলো নির্ধারিত সীমার মধ্যে রয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় চলছে।

কেন্দ্রটির সূত্র বলছে, পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর পর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে ৩০ থেকে ৪০ দিন সময় লাগতে পারে। এরপর ধাপে ধাপে চুল্লির উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানো হবে। পারমাণবিক জ্বালানি থেকে উৎপন্ন তাপ দিয়ে বাষ্প তৈরি করে টারবাইন ঘোরানোর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে।

চুল্লির উৎপাদনক্ষমতা ৩০ শতাংশে উন্নীত হলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হবে। সে পর্যায়ে প্রথম ইউনিট থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যেতে পারে। তবে গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের আগে কমিশনিং কর্মসূচির আওতায় সব প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও নিরাপত্তা যাচাই সম্পন্ন করতে হবে।

কর্মকর্তাদের মতে, গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হলেও পরীক্ষামূলক উৎপাদন চলতে পারে আরও সাত থেকে আট মাস। রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় বিশ্বের ৩৩তম দেশ হিসেবে যুক্ত হবে বাংলাদেশ।

পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের ইতিহাসে ব্যয়ের দিক থেকে সবচেয়ে বড় একক প্রকল্প। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট নির্মাণ করছে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট।

প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল। দুই দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে ২৬ হাজার কোটি টাকা। সব মিলিয়ে প্রকল্পে ব্যয় হবে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।

কেন্দ্রটি চালু হলে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতি দেড় বছর পরপর চুল্লিতে নতুন জ্বালানি ভরতে হবে। ব্যবহৃত জ্বালানি অপসারণ, নতুন জ্বালানি সংযোজন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি ইউনিট সর্বোচ্চ দুই মাস বন্ধ থাকতে পারে।

রূপপুরের প্রথম ইউনিট চালু হলে বছরে প্রায় ১০০ কোটি ডলারের জ্বালানি আমদানি সাশ্রয় সম্ভব হতো বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হওয়ায় সেই সুবিধা পেতে অপেক্ষা দীর্ঘ হয়েছে।