ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ইং (ঢাকা টিভি রিপোর্ট): চলতি বছরের শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে রেকর্ড দাবদাহ, তীব্র খরা, দাবানল ও পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এর প্রভাবে আগামী ছয় মাসে বিশ্বজুড়ে অতিরিক্ত প্রায় সাড়ে ৪ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে এক গবেষণায়।

বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাভাবিক বছরগুলোর তুলনায় চলতি বছরের জুন থেকে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত এল নিনোর প্রভাবে অতিরিক্ত ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের তাপমাত্রাজনিত মৃত্যু হতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঝুঁকিতে রয়েছে দরিদ্র দেশগুলো। এসব দেশের অনেকগুলোই এরই মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব, খাদ্যসংকট ও জ্বালানির উচ্চমূল্যের মতো সমস্যার সঙ্গে লড়াই করছে।

গবেষণার সহলেখক ও ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের সহপ্রতিষ্ঠাতা মাইকেল গ্রিনস্টোন বলেন, ফেব্রুয়ারি নাগাদ এল নিনোর প্রভাব শেষ হওয়ার কথা থাকলেও অতিরিক্ত গরমের ঝুঁকি এরপরও থাকতে পারে। এর প্রভাব আগামী বছরের গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত অনুভূত হতে পারে।

তিনি বলেন, অতিরিক্ত তাপমাত্রা বিশেষ করে আগে থেকেই উষ্ণ ও দরিদ্র অঞ্চলের জন্য বেশি বিপজ্জনক। ধনী দেশগুলোতে সাধারণত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, নির্ভরযোগ্য পানি সরবরাহ ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বেশি থাকায় তাপপ্রবাহ মোকাবিলার সক্ষমতাও তুলনামূলক বেশি।

গবেষণায় বিশ্বের ২৪ হাজারের বেশি অঞ্চলের স্থানীয় তাপমাত্রার প্রাক্কলন এবং তাপমাত্রার সঙ্গে মৃত্যুহারের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষকেরা গত তিন দশকের গড় তাপমাত্রাজনিত মৃত্যুহারের সঙ্গে ২০২৬ সালের জুন থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত এল নিনোর সময় সম্ভাব্য মৃত্যুহারের তুলনা করে অতিরিক্ত প্রাণহানির এই হিসাব করেছেন।

গবেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, জলবায়ুজনিত অতিরিক্ত গরমের সবচেয়ে বড় ধকল পড়তে পারে গ্লোবাল সাউথের উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর। আফ্রিকার সাহারা মরুভূমির দক্ষিণ প্রান্তের শুষ্ক সাহেল অঞ্চলকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে এল নিনোর কারণে অতিরিক্ত প্রায় ৬৬ হাজার ৮০০ মানুষের মৃত্যু হতে পারে।

এ ছাড়া দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলকেও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ায় মিলিয়ে প্রায় ১৯ হাজার ৪০০ জন, ইন্দোনেশিয়ায় ১৯ হাজার ৩০০, ভারতে ১৫ হাজার ৮০০ এবং ব্রাজিলে ১৩ হাজার ৩০০ জনের অতিরিক্ত মৃত্যু হতে পারে বলে গবেষণায় আশঙ্কা করা হয়েছে।

এ ধরনের প্রাণহানি ঠেকাতে সরকারের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপের সুপারিশ করেছেন গবেষকেরা। এর মধ্যে রয়েছে দাবদাহের আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা চালু, শীতলীকরণ কেন্দ্র স্থাপন, বিনামূল্যে খাবার পানির বুথ তৈরি, উন্মুক্ত স্থানে কর্মরত শ্রমিকদের সুরক্ষা, হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বয়স্ক ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা মানুষের বাড়তি নজরদারি।

এ ছাড়া তাপমাত্রা চরম পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই জরুরি অর্থ ও প্রয়োজনীয় সম্পদ প্রস্তুত রাখতে ‘পূর্বাভাসভিত্তিক অর্থায়ন’ ব্যবস্থা চালুর আহ্বান জানিয়েছেন গবেষকেরা।

ভারতভিত্তিক জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অভিযন্ত তিওয়ারি বলেন, প্রতিবেদনটি আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য নয়; বরং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরেছে। তার মতে, পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি তা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন ও প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ।

এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র। তবে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইতোমধ্যে উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীতে চলতি বছরের অস্বাভাবিক শক্তিশালী এল নিনো চরম তাপমাত্রার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের হিসাবে, এল নিনোর সময়ে বিশ্বের স্থলভাগের তাপমাত্রা স্বাভাবিক বছরের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারে। এর ফলে স্বাভাবিক বছরের তুলনায় ৪৪ শতাংশ বেশি চরম দাবদাহের দিন তৈরি হতে পারে।

গবেষকেরা বলছেন, চলতি বছরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির চিত্র ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিস্থিতির একটি ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রায় ২০ বছর পর যে মাত্রার তাপমাত্রা দেখা যেতে পারে, বর্তমান এল নিনো পরিস্থিতি তার একটি ‘আগাম বার্তা’ হিসেবে কাজ করছে। পাশাপাশি কোথায় দ্রুত পদক্ষেপ নিলে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব, তা চিহ্নিত করার সুযোগও তৈরি করছে এই পরিস্থিতি।