ক্যাম্পাস প্রতিনিধি-বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ইং (ঢাকা টিভি রিপোর্ট): ​ভৌগোলিক অবস্থান, ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তার কারণে ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া এই সুসম্পর্ক সময়ের পরিক্রমায় বাণিজ্য, অবকাঠামোগত যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই সম্পর্কে কিছু কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যার মাঝেই বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ।

​বর্তমানে দুই দেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক নির্ভরতা উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে। ভারতীয় বাণিজ্যসংক্রান্ত তথ্যানুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশে পণ্য রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ১০.৫৮ বিলিয়ন ডলার, যার বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ১.৭৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য।

​বাণিজ্যের পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা দুই দেশের কৌশলগত যোগাযোগের অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ বর্তমানে ভারত থেকে প্রায় ১,১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করছে। যৌথ উদ্যোগের অংশ হিসেবে খুলনায় নির্মিত মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট এই সহযোগিতার বড় উদাহরণ। অন্যদিকে, তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ‘ইন্ডিয়া–বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন’-এর ভূমিকা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই এই পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারতের আসাম থেকে বাংলাদেশে প্রায় ৫৭ হাজার টন ডিজেল সরবরাহ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, ২০২৬ সালের বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও পরিবহনের খরচ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ মূলত আমদানি-নির্ভর হওয়ায় বিশ্ববাজারের এই ঊর্ধ্বগতির প্রভাব সরাসরি অভ্যন্তরীণ বাজারে পড়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে চলতি সেপ্টেম্বর মাসে অতিরিক্ত ৬.৯৫ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানির অনুমোদন দিয়েছে সরকার।

​বিশ্ববাজারের সাথে সামঞ্জস্য রাখতে গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। নতুন মূল্যানুযায়ী ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে ১৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। হঠাৎ জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন খাত, কৃষি সেচ, শিল্প উৎপাদন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে মারাত্মক মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

​অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান জ্বালানি সংকট কেবল একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি আঞ্চলিক পারস্পরিক নির্ভরতা এবং ভারতের সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তাকে পুনরায় সামনে নিয়ে এসেছে। চলমান রাজনৈতিক জটিলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ভারতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে।

বিশ্লেষকদের প্রত্যাশা, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের যেমন সরবরাহের উৎস বহুমুখী করা প্রয়োজন, তেমনি ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান স্বার্থসংশ্লিষ্ট সমস্যাগুলো দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা জরুরি। রাজনৈতিক মতপার্থক্য কাটিয়ে কার্যকর কূটনীতির মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও জ্বালানি খাতকে এগিয়ে নিতে পারলে উভয় দেশই যৌথভাবে উপকৃত হবে।