অনলাইন ডেস্ক, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ইং (ঢাকা টিভি রিপোর্ট): বর্ষার ভরা মৌসুমেও পদ্মায়ও দেখা মিলছে না জাতীয় মাছ রুপালি ইলিশের। পাঁচ বছর আগের তুলনায় ইলিশ আহরণ কমে অর্ধেক হয়েছে। ফলে নদীবেষ্টিত মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার শত শত জেলে বিপাকে পড়েছেন। কষ্টে পরিবার-পরিজন নিয়ে দিন অতিবাহিত করছেন। পেশা বদলে অনেকে রিকশা কিনে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

‎এক সময় পদ্মার বুকে জাল ফেললেই উঠতো রুপালি ইলিশের ঝাঁক। ভরা মৌসুমে নদীতে ব্যস্ত পার করতেন পদ্মা পাড়ের জেলেরা। প্রতিদিনই সকাল-বিকেল জমজমাট হয়ে উঠত নদী পাড়ের মাছের ঘাট। হাটবাজারেও ডালায় ডালায় দেখা যেত রমরমা রুপালি ইলিশ।

কিন্তু সেই চিত্র এখন আর দেখা যায় না। পদ্মায় জাল ফেলেও কাঙ্ক্ষিত ইলিশের দেখা মিলছে না জেলেদের জালে। এতে করে অনেক জেলে মহাজনের ঋণ শোধ করতে পারছেন না। ফলে পরিবার-পরিজন নিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।

পদ্মায় ব্যাপকহারে ইলিশ কমে যাওয়ার ব্যাপারে মৎস্য বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, নদীর নাব্য কমে যাওয়া, পলি জমে চর ও ডুবোচর সৃষ্টি, পানিদূষণ, ইলিশের খাদ্য কমে যাওয়া, মিঠাপানির প্রবাহের পরিবর্তন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো পরিবেশগত কারণে ইলিশের বিচরণ ও প্রজনন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। পাশাপাশি নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারিতে জাটকা ও মা ইলিশ নিধনের কারণেও ইলিশের প্রজনন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশের মৎস্য অধিদপ্তরের ‘ইয়ারবুক অব ফিশারিজ স্ট্যাটিস্টিকস অব বাংলাদেশ’র ২০২০–২১ থেকে ২০২৪–২৫ অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পদ্মা নদীতে ইলিশের আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে।

‎তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে লোয়ার পদ্মা নদীতে ইলিশ আহরণ হয় ১ হাজার ১৫৯ মেট্রিক টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ১১৭ মেট্রিক টনে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সামান্য বেড়ে হয় ১ হাজার ১২২ মেট্রিক টন। পরের অর্থবছরে আবার কমে ১ হাজার ৯০ মেট্রিক টন হয়। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বড় ধস নেমে আহরণ দাঁড়ায় মাত্র ৬২২ মেট্রিক টনে।

‎এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লোয়ার পদ্মায় ইলিশ আহরণ কমেছে ৫৩৭ মেট্রিক টন। শতকরা হিসাবে কমেছে ৪৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রথম তিন অর্থবছরে আহরণে খুব বড় পরিবর্তন না থাকলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসে তা হঠাৎ অনেকটাই কমে গেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যেখানে ১ হাজার ৯০ মেট্রিক টন ইলিশ ধরা পড়েছিল, এক বছরের ব্যবধানে তা কমেছে ৪৬৮ মেট্রিক টন।

‎মানিকগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬ সালের জুন মাসের প্রতিবেদনে দেখা যায় জাতীয় মাছ ইলিশ রক্ষায় অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে ২৬২টি, মোবাইল কোর্ট করা হয়েছে ৭৫টি, ইলিশ মাছ জব্দ করা হয়েছে ৩ মেক্টিক টন, জাল জব্দ করা হয়েছে ২ লাখ ২৯ মিটার, নিয়মিত মামলা দেওয়া হয়েছে ১০৯টি। জেল প্রদান করা হয়েছে ৭০ জনকে ও জরিমানা আদায় করা হয়েছে ২ লাখ টাকা।

‎পরিসংখ্যানের এই চিত্রের সঙ্গে মিল রয়েছে নদীপাড়ের জেলেদের অভিজ্ঞতারও। জেলেদের দাবি, আগের মতো ইলিশের দেখা না পাওয়ায় নদীতে মাছ ধরার ওপর নির্ভর করে জীবন-জীবিকা অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে।

‎উপজেলার রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের বাহিরচর গ্রামের জেলে ফারুক ব্যাপারী বলেন, ‘আগে মাছ ধরেই সংসার চালাতাম। এখন নদীতে আগের মতো মাছ নেই। কৃষিকাজের পাশাপাশি মাছ ধরতে হয়। শুধু মাছ ধরে এখন আর সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না।’

নদীর গভীরতা কমে যাওয়াকেও মাছ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, নদী আগের মতো গভীর নেই। এ কারণে মাছও আগের মতো আসে না। আমরা বুঝতে পারছি না, সেই আগের মাছগুলো গেল কোথায়।’

‎হারুকান্দি ইউনিয়নের ভেলাবাদ গ্রামের জেলে লালন মোল্লাও বললেন একই কথা। তার মতে, ‘আগে নদীতে অনেক মাছ পাওয়া যেত। এখন মাছ নেই। নদীর গভীরতা কমে গেছে। জাহাজ চলাচলের শব্দেও মাছ ভয় পেতে পারে। এসব কারণেই নদীতে মাছ কমে গেছে বলে মনে হয়।’

‎নদীতে পর্যাপ্ত ইলিশ না পাওয়ার প্রভাব পড়েছে জেলেদের পেশাতেও। ফলে অনেকেই পেশা পরিবর্তন করছেন বলে দাবি দড়িকান্দি গ্রামের কার্ডধারী জেলে লিটনের। তিনি বলেন, ‘নদীতে ইলিশ পাওয়া যায় না। তাই নৌকা ও জাল বিক্রি করে একটি রিকশা কিনেছি। এখন রিকশা চালিয়েই সংসার চালাই।’

ইলিশ সাধারণত ডিম ছাড়ার জন্য সমুদ্র থেকে নদীতে আসে। এ সময় পানির প্রবাহ, তাপমাত্রা, লবণাক্ততা ও খাদ্যপ্রাপ্যতাসহ বিভিন্ন পরিবেশগত বিষয় তাদের বিচরণ ও প্রজননে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া, বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন এবং নদীর পানির গুণগত মানের পরিবর্তন ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণে প্রভাব ফেলতে পারে।

বেসরকারি গবেষণামূলক ও পরিবেশবান্ধব সংগঠন বারসিকের উপজেলা প্রোগ্রাম অফিসার মো. মুক্তার হোসেন জানান, নদীর নব্য সংকট, নদীতে অপরিকল্পিত বর্জ্য ও দূষণ বাড়ায় জলজ পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারি দিয়ে জাটকা ও মা ইলিশ ধরার ফলে ইলিশের প্রজনন অনেকটাই কমে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ উৎপাদনও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

‎হরিরামপুর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নূরুল ইকরাম বলেন, ‘প্রাকৃতিক বিভিন্ন কারণে ইলিশের প্রজনন ও বিচরণে প্রভাব পড়তে পারে। ইলিশের খাদ্য কমে যাওয়া, নদীতে চর সৃষ্টি, জাহাজ চলাচল এবং নদীদূষণ; এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।’

নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কিছু মানুষ নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারি ব্যবহার করে মা ইলিশসহ বিভিন্ন মাছ শিকার করছে। এতে ইলিশের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। অবৈধভাবে মাছ শিকারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও কঠোরভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

মানিকগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শেখ মনিরুল ইসলাম মনির বলেন, ‘নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, নদীদূষণ, মানুষের অসচেতনতা এবং কিছু মৌসুমি জেলের নিষিদ্ধ সময়ে মা ইলিশ শিকার, এসব কারণে জেলার পদ্মা-যমুনায় ইলিশ কমে গেছে।’

সৌজন্যে কালবেলা