আব্দুল্লাহীল কাফী মাসুম, ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি-রংপুর, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ইং (ঢাকা টিভি রিপোর্ট): ব্রিটিশ শাসনামলে রংপুর শহর ছিল উত্তরাঞ্চলের জমিদারদের অন্যতম শহুরে আবাসস্থল ও বিচরণভূমি। রংপুর শহরজুড়েই ছিল আশপাশের বিভিন্ন জমিদার পরিবারের বসবাস ও শহরের বাড়িঘর । নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার জমিদার বা রাজ পরিবারের এমন একটি আবাস স্থল গড়ে ছিল রংপুর শহরের মাহিগঞ্জে। তাজহাট জমিদারবাড়ি আজও অন্যতম। অনেক দর্শনীয় স্থাপনার মধ্যে জানকীবল্লভের অপরুপ নির্মাণশৈলীর একটি স্থাপনা মাহিগঞ্জের ওই কালীমন্দির।

শত বছর পেরিয়ে গেলেও ডিমলা রাজাদের নির্মিত ওই মন্দিরটি আজও রংপুর শহরের একটি উল্লেখযোগ্য স্থাপনা হিসেবে টিকে আছে এবং দর্শনার্থীদের আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে রয়েছে। আজ ১৫ সেপ্টেম্বর পড়ন্ত বিকেলে ঐতিহাসিক স্থাপনা মন্দিরটি দেখতে গিয়েছিলাম। অষ্টকোণাকৃতির এই মন্দিরটি বাংলাদেশের প্রচলিত অনেক মন্দিরের তুলনায় বেশ আলাদা। দ্বিতল কাঠামোর আটটি দেয়ালের উপরে রয়েছে বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তির টেরাকাটা। আর দ্বিতীয় তলার ওপরের অংশে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন একটি গম্বুজ। সব মিলিয়ে স্থাপনাটির নির্মাণশৈলীতে রয়েছে এক ধরনের স্বতন্ত্র বৈশিষ্টের সৌন্দর্য। শতবর্ষের ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই মন্দিরটি সামনে থেকে দেখে সত্যিই ভালো লাগল। সৌন্ধর্যপিপাসুদের কাছে মন্দিরের দর্শন, হৃদয়িক তৃপ্তির উপকরণ বলে মনে করা হয়।

মন্দিরটি রংপুর সদর উপজেলায় রংপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে পূর্বদিকে এবং মাহিগঞ্জ বাজার থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার দক্ষিণে বড় রঙ্গপুরে অবস্থিত। তৎকালীন ডিমলার জমিদার নীল কমলের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী শ্যামা সুন্দরীর দত্তক পুত্র রাজা  জানকীবল্লভ সেনের সেবামূলক কাজের স্মৃতিস্বরূপ ১৯০৮ সালে মন্দিরটির নির্মাণ শুরু হয়। একই বছর শ্রী শ্রী কালী মাতা বিগ্রহ, শ্রী শ্রী লক্ষী নারায়ণ জিউ বিগ্রহ, শ্রী শ্রী মদন মোহন জিউ বিগ্রহ, শ্রী শ্রী রাম চন্দ্র বিগ্রহের নামে রাজা জানকীবল্লভ সেন তার সম্পত্তি ডিমলা রাজদেবত্তোর এস্টেটের নামে দান করেন। তবে কাজ শুরু হবার দুই বছর পর রাজা জানকি বল্লভ সেন মারা যান, এবং তার স্ত্রী রাণী বৃন্দারানী চৌধুরানী ডিমলা রাজদেবত্তোর এস্টেট পরিচালনার দায়িত্ব নেন। প্রায় আট বছর পর ১৯১৬ সালে মন্দিরটির নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয়।

মন্দিরের প্রতিটি স্তরে রয়েছে শৈল্পিক সৌন্দর্যের পূজারী স্থপতি ও চিত্রকলা শিল্পীদের নিপুণ ছোঁয়ায় সৃষ্ট চমৎকার শিল্পকর্ম। মন্দিরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে ব্যাঘ্র মূর্তি। যেন পুরো মন্দিরটি বাঘের পাহাড়ায় রয়েছে। এটি প্রায় ৩ ফুট উঁচু অষ্টকোণাকার ভিত্তিবেদীর ওপরে দ্বিতল বিশিষ্ট পদ্ধতিতে নির্মিত। ৫০ ফুট উঁচু নকশাটি অষ্টকোণাকৃতি। প্রথম তলার প্রতিটি কোনায় সুশোভিত রয়েছে একেকটি করে অষ্টকোণাকৃতি কর্ণার স্তম্ভ, যা পত্রপল্লবের ভাস্কর্য দ্বারা খচিত৷ ৮টি স্তম্ভের মধ্যবর্তী খিলানে রয়েছে মহেশ্বরী, বারাহী, কৌমারী, নারসিংহী,ব্রাহ্মী, চামুন্ডা ও অপরাজিতা রূপে নির্মিত অষ্ট দেবীমূর্তি। দ্বিতীয় তলার অষ্টকোণে স্থাপিত লক্ষ্মী, সরস্বতী, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, শীতলাকালী, বামন অবতার ও বরাহ অবতারের মূর্তি। দ্বিতীয় তলার নিম্নদেশে প্রতিটি কোণায়পাখির ডানাযুক্ত মানবাকৃতি ভাস্কর্য দ্বারা শোভাবর্ধক করা হয়েছে। এছাড়াও মন্দিরের শীর্ষে স্থাপিত হয়েছে পিতলের ৩টি কলস এবং ১টি ত্রিশুল।

বর্তমানে মন্দিরে নানা সমস্যা রয়েছে বলে এ প্রতিবেদককে জানান পুরোহিত, পরিচর্যাকারীসহ স্থানীয়রা। মন্দিরের পুরোহিত রবিরঞ্জন চক্রবতী ও পরিচর্যাকারী অনাথ চন্দ্র বর্মন বলেন, মন্দিরের প্রাচীর কিছুটা ভঙ্গুর, মেঝের টাইলস, দেয়ালের প্লাস্টারও জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। পানির সমস্যা, সেইসঙ্গে স্যানিটেশন ব্যবস্থাও তেমন নেই। আমরা চাই আমাদের এই ঐতিহ্যবাহী মন্দিরটি মডেল মন্দিরে রূপান্তর করবে সরকার। তাহলে আগামী প্রজন্মের কাছেও রংপুরের এই সুবৃহৎ মন্দিরটির প্রাধান্য থাকবে। মন্দিরটিকে সংস্কার করে মডেল মন্দিরে রূপান্তর করার দাবি জানান স্থানীয়রা। স্থানীয়রা বলেন, দেশের বাইরে থেকে দর্শনার্থীরা এসে অবাক চোখে প্রসংশা করেন। চমৎকারভাবে, নিখুঁত নকশায় এই মন্দির সত্যি প্রশংসনীয়। এটি সংস্কার করে আবারও সৌন্দর্য ফিরিয়ে দিলে সবার কাছে এর সুনাম খ্যাতি অব্যাহত থাকবে। কালের পরিক্রমায় অনেক কিছু বিলুপ্তি হয়ে গেলেও এখনো মানবসেবা ও জনকল্যাণমূলক এই নিদর্শনগুলো সমৃদ্ধ ইতিহাসকে বুকে ধারণ করেছে। ঠিক তেমনি শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ভালবাসায় ভূমিকা পালন করছে ভক্তরা। বিভিন্ন পূজা অর্চনার পাশাপাশি উৎসব আয়োজনে ভক্তদের আগমনে ভরে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ।