ঢাকা, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ইং (ঢাকা টিভি রিপোর্ট): আজ বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের চতুর্থ দিন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. রুহুল আমিনের লিখিত প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেছেন, তিন বছরে দেশের ৪ শতাধিক তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা ও একের পর এক যুদ্ধের অভিঘাতের পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার কারণে এ সংকট তৈরি হয়েছে।
একই সময়ে ইউরোপের সঙ্গে ভারত ও ভিয়েতনামের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে প্রতিযোগিতার চাপ বাড়িয়েছে। ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোতে বিদেশি ক্রেতাদের রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে বলে সংসদে জানিয়েছেন তিনি।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত তিন বছরে বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) ২৮২টি এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) ১২০টি সদস্য কারখানা বন্ধ হয়েছে। সব মিলিয়ে বন্ধ কারখানার সংখ্যা চার শতাধিক। বন্ধ কারখানাগুলোর নামের তালিকা সংগ্রহের কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলেও জানান তিনি।
গত ২২ জুন বিজিএমইএ প্রকাশিত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী কারখানা বন্ধের আটটি কারণ তুলে ধরেন। এগুলো হলো বিশ্বব্যাপী করোনা পরিস্থিতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ, আমেরিকা-ইরানের মধ্যে সংঘাত, আন্তর্জাতিক মন্দা, দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থ পাচারের কারণে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট এবং ইউরোপের সঙ্গে ভারত ও ভিয়েতনামের এফটিএ চুক্তি।
এ ছাড়া বিদেশি ক্রেতাদের নিজস্ব মনিটরিং সুবিধার জন্য ছোট ও মাঝারি কারখানায় রপ্তানি আদেশ দিতে অনাগ্রহকেও কারখানা বন্ধের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
পোশাক রপ্তানিতে বড় ঝুঁকি
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অবস্থান ধরে রাখতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী তিনি বলেন, বাংলাদেশ শিগগিরই স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হবে। ফলে উন্নত দেশগুলোর ট্রেডিং স্কিমের আওতায় বিদ্যমান অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাবে প্রায় ১৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
বিএনপির সংসদ সদস্য জাহান্দার আলী মিয়ার প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাত থেকে রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৪ হাজার ৫০৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। চলতি বছরের জুলাই মাসে এ খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ৩ হাজার ৮৮৬ দশমিক ৭২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে
এদিকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতিও বেড়েছে। জামায়াতের সংসদ সদস্য আব্দুল বাতেনের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় পৌনে ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ ভারতে ১ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। বাকি অর্থের পণ্য ভারত থেকে বাংলাদেশে এসেছে। মন্ত্রী বলেন, ভারতের পাশাপাশি চীনের সঙ্গেও বাংলাদেশের বড় বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। তবে সরকার কোনো একটি দেশের সঙ্গে আলাদাভাবে ঘাটতি দেখছে না। বরং সামগ্রিকভাবে দেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
রপ্তানি বাড়াতে চামড়া, পাট, জাহাজ নির্মাণ, হালকা প্রকৌশল ও সেমিকন্ডাক্টরসহ কয়েকটি খাত চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানান তিনি। এসব খাতে নীতি সহায়তা, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
ভারতের বাজারে সুযোগ, আছে বাঁধাও
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ভারতের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তবে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ভারতের দিক থেকে কিছু বাধা রয়েছে। একই সঙ্গে গত দুই বছরে বাংলাদেশের দিক থেকেও কিছু প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি ভারতের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলের বাংলাদেশ সফরের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই প্রতিনিধি দল বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মিলে অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। সরকার এ প্রস্তাবে আগ্রহ দেখিয়েছে।
ভারত থেকে বাংলাদেশের বেশি আমদানির কারণ ব্যাখ্যা করে মন্ত্রী বলেন, আমদানির বড় অংশই করে বেসরকারি খাত। ব্যবসায়ীরা যেখান থেকে প্রতিযোগিতামূলক কম দামে পণ্য পান, সেখান থেকেই আমদানি করেন।
সংসদে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৭ হাজার ৩১৩ দশমিক ৮৩ মিলিয়ন ডলার। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১ হাজার ৬৯৮ দশমিক ৬০ মিলিয়ন ডলারে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ঘাটতি ছিল ৭ হাজার ৭১৬ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭ হাজার ৪৩০ দশমিক ৯৬ মিলিয়ন এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭ হাজার ৮৫৯ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
ভোজ্যতেল প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর
চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, দেশের ভোজ্য তেলের চাহিদার প্রায় সম্পূর্ণটাই আমদানিনির্ভর। বর্তমানে দেশে বছরে আনুমানিক ২২ থেকে ২৫ লাখ মেট্রিক টন ভোজ্য তেলের প্রয়োজন হয়।
কুষ্টিয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল গফুরের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ২২ দশমিক ৭৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পান রফতানি করেছে। লেবানন, ওমান, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রে এ পণ্য রপ্তানি করা হয়েছে।
সংরক্ষিত নারী আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, দুই স্ট্রোক ইঞ্জিনবিশিষ্ট থ্রি-হুইলার, টেম্পো, অটোরিকশাসহ সংশ্লিষ্ট যানবাহন আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২৯ অনুযায়ী আমদানি নিষিদ্ধ। তবে স্থানীয়ভাবে ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলার উৎপাদন শিল্পকে সহায়তার জন্য যন্ত্রাংশ আমদানি করা হচ্ছে।
গোপালগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য সেলিমুজ্জামান মোল্যার প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এআরটি চুক্তির ফলে বাংলাদেশ প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় দেশটির বাজারে রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছে।