আব্দুল্লাহীল কাফী মাসুম, ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি-রংপুর, ২৫ আগষ্ট ২০২৬ইং (ঢাকা টিভি রিপোর্ট): রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে ফরেনসিক বিভাগ। নিহতদের মুখমণ্ডল বিকৃত হয়ে গেলেও সেখানে অ্যাসিড বা অন্য কোনো রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের আলামত পাওয়া যায়নি। রোববার (২৩ আগস্ট) সন্ধ্যায় চারটি মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে গণমাধ্যমকে এসব তথ্য জানান রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস।

তিনি জানান, চারটি মরদেহ থেকেই প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব নমুনা পরীক্ষার জন্য সিআইডির ল্যাবে পাঠানো হবে। সেখান থেকে প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত মতামত দেওয়া হবে।

ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস বলেন, প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। মুখমণ্ডলের বিকৃতির কারণ পচন ধরা। সেখানে অ্যাসিড বা অন্য কোনো রাসায়নিক ব্যবহারের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি।

তিনি আরও জানান, নিহত প্রার্থী চক্রবর্তীর চোয়াল ভাঙার কোনো আলামতও ময়নাতদন্তে পাওয়া যায়নি।

এর আগে শনিবার (২২ আগস্ট) রাত ১১টার দিকে রংপুর নগরের কামালকাছনা-মাছুয়াপাড়ার নিজ বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, ২৫ বছর বয়সী মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী এবং ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

এ ঘটনায় রোববার ভোরে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ নামে দুজনকে আটক করা হয়। পরে বিকেলে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে থানায় হত্যা মামলা করেন।
এর আগে রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক কারণ ও ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির পাশের একটি ভবনের ছাদ দিয়ে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ তার বাড়ির ছাদে প্রবেশ করেন। সেখানে তারা মাদক সেবন করছিলেন। একপর্যায়ে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে উঠে তাদের দেখতে পান এবং এ বিষয়ে বকাঝকা করেন।

পুলিশের দাবি, মাদক সেবনের বিষয়টি অন্যদের জানিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা থেকেই দুই যুবক তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। একপর্যায়ে সঙ্গে থাকা গামছা দিয়ে তার গলায় পেঁচিয়ে ধরলে ধস্তাধস্তি শুরু হয়।

পুলিশ কমিশনার জানান, গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যার সময় তার চিৎকার বা ধস্তাধস্তির শব্দ শুনে স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে সিঁড়িতে তাকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়।

পরে মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী এগিয়ে এলে তাকেও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এরপর ঘরে থাকা ১২ বছর বয়সী আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মকেও হত্যা করা হয় বলে পুলিশের দাবি। প্রিয়ম আসামিদের চিনত এবং ভবিষ্যতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা জানিয়ে দিতে পারে এমন আশঙ্কা থেকেই তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

হত্যাকাণ্ডের পর দুই অভিযুক্ত ওই বাড়ির ওয়াশরুমে গোসল করেন এবং পরে আবার মাদক সেবন করেন বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। পুলিশ বলছে, এরপর তারা বাসার আসবাবপত্র তল্লাশি করে স্বর্ণালংকার বের করে নেয়। পুলিশের দাবি, সিদ্ধার্থ একটি সোনার দোকানে কাজ করায় আগুন দিয়ে পরীক্ষা করে আসল সোনা শনাক্ত করা হয়। পরে শুক্রবার জুমার নামাজের সময় আশপাশের লোকজন মসজিদে গেলে তারা পাশের বাড়ির ছাদ দিয়ে বেরিয়ে যায়।

পুলিশ আরও জানিয়েছে, বের হওয়ার আগে তারা ডাইনিং টেবিলে বসে বয়ামে রাখা খেজুর খায়। পাশাপাশি মাদকের প্রভাব কমানোর জন্য ফ্রিজ থেকে শসা বের করে খেয়েছিল বলেও তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।

রংপুর মহানগরীর কামালকাছনা মাছুয়াপাড়া এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামিকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আদালতে তারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর বিচারক তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

রোববার (২৩ আগস্ট) বিকেলে গ্রেপ্তারকৃত আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে আদালতে হাজির করা হলে তারা মুখ্য মহানগর হাকিম মো. রফিকুল ইসলামের খাসকামরায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। আসামিরা দুজন সম্পর্কে মামাতো-ফুফাতো ভাই। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে রাতেই তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও রংপুর মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি জানান, দুই আসামি আদালতে হত্যাকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন। তারা অপরাধ স্বীকার করায় আলাদা করে রিমান্ডে নেওয়ার কোনো প্রয়োজন হয়নি।

তিনি আরও জানান, জবানবন্দিতে আসামিরা এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তবে সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে এই মুহূর্তে সব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না। ঘটনার পেছনে আর কেউ জড়িত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখে সব অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।

এর আগে শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে নিজেদের বসতবাড়ি থেকে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের রক্তাত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পরপরই রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ অভিযানে নেমে রোববার ভোরে মাছুয়াপাড়া থেকে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে গ্রেপ্তার করে।

রংপুরে ৪ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় যা জানাল সিআইডি
মামলার এজাহার অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) রাত সাড়ে ১১টার দিকে গণপতির স্ত্রী প্রীতিলতা তার মোবাইল ফোন থেকে ছোট বোন পূজা চক্রবর্তীর সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে কথা বলেন। এরপর পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে পড়েন। পরদিন শুক্রবার রাত ২টা ৪০ মিনিট থেকে শনিবার রাত ৮টা ৪৫ মিনিটের মধ্যে কোনো এক সময় হত্যাকাণ্ডটি ঘটে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
শনিবার রাত ৮টা ৪৫ মিনিটের দিকে পূজা আবারও বড় বোন প্রীতিলতার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু তখন পরিবারের চারজনের মোবাইল ফোনই বন্ধ পাওয়া যায়। এতে সন্দেহ হলে তিনি স্বামী বিপুল আচার্যকে নিয়ে রাতে বোনের বাড়িতে যান।

তারা গিয়ে বাড়িটিকে অন্ধকার দেখতে পান এবং ভেতর থেকেও কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে প্রতিবেশীর বাড়ির ওপর দিয়ে পূজা গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ওঠেন। জানালার তালা ভেঙে টর্চের আলোয় ঘরের ভেতরে তাকিয়ে তিনি দেখতে পান, জিনিসপত্র এলোমেলো অবস্থায় পড়ে আছে। একই সঙ্গে বাড়ির ভেতর থেকে পচা গন্ধও বের হচ্ছিল।

এজাহারে বলা হয়, বাড়ির আলমারি, শোকেস, আসবাবপত্র ও কাপড়চোপড়সহ বিভিন্ন জিনিস ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। এতে হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে বা অন্যভাবে উপস্থাপন করতে জিনিসপত্র এলোমেলো করা হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হয়েছে।

পুলিশ জানায়, ঘরে পাওয়া একটি স্বর্ণের চুড়ি আগুনে পরীক্ষা করার আলামত থেকেই তদন্তে নতুন সূত্র মেলে। পরে সিদ্ধার্থের স্বর্ণের কাজে অভিজ্ঞতার বিষয়টি সামনে আসে। লুট করা স্বর্ণালংকার তাদের দেখানো মতে একটি পরিত্যক্ত জায়গা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

এ ছাড়া বাড়ির দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়েছিল। পুলিশের ধারণা, আলামত নষ্ট করতেই এমনটি করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে ইয়াবা সেবনের আলামত, খেজুরের বিচি ও কামড় দেওয়া শসাও উদ্ধার করা হয়েছে। খেজুরের বিচি ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।