সিলেট, ১৪ আগষ্ট ২০২৬ইং (ঢাকা টিভি রিপোর্ট): সিলেটে তীব্র গ্যাস সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক-শ্রমিক ও যাত্রীরা। পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস না পাওয়ায় শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ করেছেন চালকরা। একপর্যায়ে শিবগঞ্জের সুরমা অটো কেয়ার পাম্পের সামনে সিলেট-তামাবিল সড়ক অবরোধ করলে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
নগরীর শিবগঞ্জ, আম্বরখানা, সুবিদবাজার ও পাঠানটুলা এলাকার বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে সকাল থেকেই গ্যাসের জন্য দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। প্রচণ্ড গরমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অনেক চালক গ্যাস না পেয়ে ক্ষোভে সড়কে নেমে আসেন। গ্যাসের অভাবে গাড়ি চালাতে না পারায় আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানান তারা। সংকটের প্রভাব পড়েছে সাধারণ যাত্রীদের ওপরও।
শুক্রবার দুপুরে পাঠানটুলা এলাকার নর্থ ইস্ট সিএনজি পাম্পে গ্যাসের জন্য অপেক্ষমাণ টুকের বাজারের বাসিন্দা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সোহেল মিয়া গনমাধ্যমকে বলেন, সকাল থেকে গাড়ি নিয়ে পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস পাচ্ছি না। গ্যাস না থাকলে গাড়ি চালাব কীভাবে, আর সংসারই বা চলবে কীভাবে? আমাদের আয় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
গোয়াবাড়ি এলাকার সিএনজিচালক রফিক মিয়া বলেন, প্রচণ্ড গরমের মধ্যে সকাল থেকে পাম্পে দাঁড়িয়ে আছি। সামনে অনেক গাড়ি, কিন্তু গ্যাসের চাপ নেই। কখন গ্যাস পাব, সেটারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। এভাবে দিনের পর দিন চললে আমাদের না খেয়ে থাকতে হবে।
প্রাইভেটকার চালক রনি আহমদ বলেন, নগরীর এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ঘুরছি, কোথাও গ্যাস পাচ্ছি না। যেসব পাম্পে গ্যাস আছে, সেখানে এক কিলোমিটার পর্যন্ত গাড়ির লাইন। আগে থেকে জানালে আমরা বিকল্প ব্যবস্থা নিতে পারতাম।
পাঠানটুলার বাসিন্দা যাত্রী ঝুমা আক্তার বলেন, জরুরি কাজে বের হয়েছি, কিন্তু গাড়ি পাচ্ছি না। যেসব গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোও গ্যাসের জন্য পাম্পে দাঁড়িয়ে আছে। এতে আমাদের মতো সাধারণ যাত্রীদের সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি হচ্ছে।
এর আগে গত বুধবার জালালাবাদ গ্যাস এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় পর্যায়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ অনাকাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কমে গেছে। ফলে সারা দেশের মতো জালালাবাদ গ্যাসের বিতরণ এলাকাতেও স্বল্প চাপ বিরাজ করছে। এ পরিস্থিতিতে গ্যাসের ব্যবহার ৫০ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার অনুরোধ জানানো হয়।
এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সিলেট বিভাগ জানায়, জাতীয় গ্যাস সংকটের কারণে সিএনজি অ্যাসোসিয়েশন সিলেট বিভাগ ও জালালাবাদ গ্যাস লিমিটেডের সঙ্গে সমন্বয় সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৩ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরবর্তী পাঁচ দিন সকাল ৮টা পর্যন্ত সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধ থাকবে।
তবে পাম্প মালিকদের একাংশের দাবি, সিদ্ধান্তটি আগাম পর্যাপ্ত সময় দিয়ে জানানো হয়নি। এতে চালক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং একসঙ্গে পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে। জনদুর্ভোগ বিবেচনায় নগরের গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিএনজি ফিলিং স্টেশন খোলা রাখার কথাও জানিয়েছেন মালিকদের দায়িত্বশীলরা।
সিএনজি মালিক সমিতি সিলেট বিভাগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার রিয়াশাদ আজিম হক আদনান কালবেলাকে বলেন, দেশের মূল এলএনজি আমদানি টার্মিনালের এফএসআরইউ ইউনিটে অগ্নিকাণ্ডের কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। এ কারণে সিলেট থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে স্থানীয়ভাবে গ্যাসের চাপ অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। এতে সিএনজি পাম্পের কম্প্রেসর মেশিন ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না এবং অনেক পাম্পে গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, আগাম ঘোষণা ছাড়া রাত ৯টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত পাম্প বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে চালক ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষার পর ক্ষুব্ধ চালকরা পাম্পের সামনে ও সড়কে বিক্ষোভ-অবরোধ করেছেন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত পাম্প বন্ধ থাকার কথা। অতিরিক্ত সময় বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্টদের জানানো প্রয়োজন ছিল।
রিয়াশাদ আজিম হক আদনান আরও বলেন, গ্যাসের সুষম বণ্টনে বিদ্যুৎ ও শিল্পখাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। আমদানিকৃত এলএনজি নিয়ে একটি জাহাজ নোঙর করেছে। এলএনজি খালাস শুরু হলে এক-দুই দিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হতে পারে। পাশাপাশি কারিগরি মেরামত চলছে। আগামী তিন-চার দিনের মধ্যে সংকট পুরোপুরি সমাধানের আশা করা হচ্ছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে মেরামত ও এলএনজি খালাস শেষ হলে সিলেটের সিএনজি সংকটও অনেকটা দূর হবে।
সিএনজি মালিক সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক হুমায়ূন আহমেদ গনমাধ্যমকে বলেন, গ্যাস অফিস সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাস ব্যবহারে ৫০ শতাংশ সীমা নির্ধারণ করলেও বাস্তবে সরবরাহ আরও কমে গেছে। ফলে সিলেটের অধিকাংশ পাম্পে তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। স্থানীয় গ্রিডে গ্যাসের চাপ অনেক সময় ১ বার, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে শূন্য দশমিক ৭ বারে নেমে আসায় মেশিন চালিয়ে গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এর সঙ্গে বিদ্যুতের বিল বেড়ে যাওয়ায় পাম্প পরিচালনায় মালিকদের লোকসান হচ্ছে।
তিনি বলেন, সংকট সমাধানে জালালাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকে সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত পর্যাপ্ত চাপের গ্যাস দেওয়ার আশ্বাস মিললেও বাস্তবে তা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে পাম্পগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে। সংকট নিরসনে সমিতির বিশেষ সভা করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগসহ পরবর্তী কর্মসূচি ঠিক করা হবে।
হুমায়ূন আহমেদ আরও বলেন, গ্যাস না থাকায় গ্রাহকদের ক্ষোভের মুখে পাম্পকর্মীরা গালিগালাজ এমনকি মারধরের শিকার হচ্ছেন। এতে কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।