মোহাম্মদ রহিসুল হক রইস-এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, ২৪ জুলাই ২০২৬ইং : ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর রাজাবাজারের একটি এপার্টমেন্টে একমাত্র শিশুপুত্র মেঘের সামনে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনি। চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার বিচার গত ১৪ বছর যাবত তদন্ত পর্যায়ে আটকে আছে, যার ফলে দেশের বিচার ব্যবস্থা নিয়ে জনমনে ব্যাপক আস্থার সংকট তৈরি হয়। মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার তারিখ এ পর্যন্ত ১২৮ বার পেছানো হয়েছে। আগামী ২৭ আগষ্ট প্রতিবেদন জমা দেয়ার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।

র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ান (র‌্যাব) প্রাথমিকভাবে মামলার তদন্ত কাজ শুরু করলেও তাদের কাজে অগ্রগতি সাধিত না হওয়ায় ২০২৪ সালে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেষ্টিগেশন (পিবিআই)-এর উপর মামলার তদন্তভার ন্যাস্ত করা হয়। মামলাটি এখন পর্যন্ত তদন্ত স্তরে থেমে থাকায় ন্যায় বিচার প্রাপ্তি এখন অনেকটাই প্রশ্নবিদ্ধ। সাগর-রুনি হত্যাকান্ডের মত পনের-বিশ বছর কিংবা আরো বেশী সময় ধরে দেশের বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন শতাধিক চাঞ্চল্যকর মামলা আদৌ সুরাহা হবে কিনা, তা নিয়ে জনমনে সংশয় দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় দীর্ঘ সময় ধরে মামলাজট বিরাজ করছে, যার ফলে মামলার আলামত ও সাক্ষ্য-প্রমাণ আদালতে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হচ্ছেনা। স্বাভাবিক বিচারিক কার্যক্রম প্রলম্বিত হওয়ায় মানুষ ন্যায় বিচার হতে বঞ্চিত হচ্ছে। অপরাধীরা যথা সময়ে শাস্তির আওতায় না আসার কারনে, তাঁরা আইনের বিধি-বিধান উপেক্ষা করে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে দেশের আইন শৃঙ্খলা কাঠামো ভেঙে পড়ছে এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা কমে যাচ্ছে।
দেশের অধস্তন ও উচ্চ আদালতে বর্তমানে প্রায় ৪৮ লক্ষ মামলা বিচারাধীন রয়েছে, এর মধ্যে শুধু আপীল বিভাগেরই ৩৭ হাজারেরও বেশী মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান গত ১৬ এপ্রিল ২০২৬ ইং তারিখে জাতীয় সংসদের এক অধিবেশনে জানিয়েছেন গত ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫ ইং তারিখের হিসাব অনুযায়ী দেশের নিম্ন আদালতে ৪৪১,৯২৪ টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে আলোচিত অনেক চাঞ্চল্যকর মামলা বর্তমানে বিচারিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে নিষ্পত্তিহীন অবস্থায় আদালতে আটকে রয়েছে। অনেক মামলা বছরের পর বছর তদন্তাধীন রয়েছে। এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করে ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পিলখানায় সংঘটিত আলোচিত বিডিআর বিদ্রোহে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা সহ ৭৪ জন হত্যার শিকার হয়। বিশেষ ট্রাইবুনালে বিচারে কয়েক শ সেনা অফিসারকে অভিযুক্ত করা হয়। ২০১৩ সালে তাদের বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় ঘোষণা করে টাইবুনাল। আসামী পক্ষ উচ্চ আদালতে আপীল করলে, ২০১৭ সালের এক রায়ে উচ্চ আদালত ট্রাইবুনালের রায় বহাল রাখে। মামলাটি বর্তমানে আপীল বিভাগে অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে। ২০১৩ সালে নারায়ণগঞ্জে সংঘটিত সতের বছর বয়সী মেধাবী ছাত্র তানভির মোহাম্মদ ত্বকী হত্যাকান্ডের বিচারকার্য এখনো সম্পন্ন শেষ হয়নি। মামলার তদন্তভার গ্রহণ করার পর র‌্যাব কারো বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনলেও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল না করার কারনে মামলা বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে।

২০১২ সালে তৎকালীন বিরোধী দলের ডাকা হরতাল কর্মসূচীর সময় বিশ^জিৎ নামক এক তরুণ দর্জি দোকানের মালিককে প্রকাশ্য দিবালোকে কপিয়ে হত্যা করে ছাত্রলীগের কর্মীরা। মামলাটি বর্তমানে উচ্চ আদালতে আপীল পর্যায়ে রয়েছে। ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধ্বসে ১১৩০ জন গার্মেন্টস কর্মী নিহত হয়। এক যুগেরও বেশী সময় অতিবাহিত হলেও মামলাটি এখন পর্যন্ত সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রয়েছে। ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল সংঘটিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র সহ সাত খুনের মামলার বিচার এখনো শেষ হয়নি। উক্ত মামলায় নিম্ন আদালত ১৫ জনের বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় ঘোষণা করে। ২০১৭ সালে নিম্ন আদালত ২৬ জন আসামীকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করে। একই বছর হাইকোর্ট ১৫ জনের মৃত্যুদন্ড বহাল রাখে এবং ১১ জনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন দেয়। মামলাটি বর্তমানে আপীল বিভাগে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য রয়েছে।

৫ জুন, ২০১৬ সালে চট্টগ্রামে পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী মিতু হত্যা সংঘটিত হয়। ২৫ জানুয়ারি ২০২২ সালে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেষ্টিগেশন আসামীদের অব্যহতি দিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিলেও আদালত তা খারিজ করে পূনঃতদন্তের আদেশ দেয়। মামলাটি বর্তমানে অধস্তন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এর দুই মাস আগে ২০ মার্চ কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের মত নিরাপদ এলাকায় সোহাগী জাহান তনু নামের উনিশ বছর বয়সী এক থিয়েটার কর্মীর মরদেহ পাওয়া যায়। তাকে ধর্ষণ করার পর হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। ব্যাপক জন বিক্ষোভের মুখে একাধিকবার মরদেহের ময়না তদন্ত করা হয়। ২০২৬ সালে এই মামলার আসামী সেনাবাহিনীর ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান প্রেপ্তার হয়। মে মাসে ডিএনএ টেস্টে চারজনের আলামত মিলেছে। এ পর্যন্ত আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন বিভাগে মামলার তদন্তভার ন্যাস্ত করা হলেও এখন পর্যন্ত তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়েনি।

১ জুলাই, ২০১৬ সালে রাজধানীর হলি আর্টিজান হোটেলে জঙ্গী হামলায় বিদেশী নাগরিক সহ ২২ জন নিহত হয়। ২০১৯ সালে ঢাকার বিশেষ ট্রাইবুনাল ৭ জনকে মৃত্যুদন্ড ও ১ জনকে খালাসের সাজা দেয়। হাইকোর্ট ৭ জনের মৃত্যুদন্ডের কমিয়ে স্বাভাবিক মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত যাবজ্জীবন করে। মামলাটি বর্তমানে আপীল বিভাগে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য রয়েছে। ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিত রায়কে হত্যা করা হয়। ঢাকার সন্ত্রাস বিরোধী বিশেষ ট্রাইবুনাল নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের পাঁচ সদস্যকে মৃত্যুদন্ডের রায় প্রদান করে, যা এখন পর্যন্ত কার্যকর হয়নি।

আলোচিত এসব মামলা ছাড়াও অনেক চাঞ্চল্যকর মামলা দেশের বিভিন্ন অধস্তন ও উচ্চ আদালতে বছরে পর বছর বিচারের অপেক্ষায় ঝুলে আছে। ন্যায় বিচার প্রাপ্তির প্রত্যাশায় ভুক্তভোগী বিচার প্রার্থী মানুষ প্রতিদিন আদালতের দারস্থ হচ্ছেন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আদালতে বিচারাধীন লক্ষ লক্ষ মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সরকার কিছু বাস্তবমূখী পদক্ষেপ গ্রহণ করার কথা জানিয়েছেন। দেওয়ানি কার্যবিধি (সংশোধনী) বিল ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদে পাশ হয়েছে। মুঠোফোনে ক্ষুদে বার্তা কিংবা ফোনে সমন প্রদান, হলফনামার মাধ্যমে মামলার আরজি ও লিখিত জবাব দাখিল, সরাসরি জেরা, জারি ব্যতিরেকে সরাসরি মূল মামলার রায়ে ডিক্রি কার্যকর করা সহ বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তি করার কথা বলেছেন। এছাড়া, ফৌজদারি কার্যবিধি (সংশোধনী) বিল সংসদে পাশ হয়েছে। যার মধ্য দিয়ে আদালতে দীর্ঘদিন যাবত আটকে মামলার বিচার কার্য খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। অনলাইনে তদন্ত কর্মকর্তা ও ডাক্তারদের সাক্ষী ও ম্যাজিষ্ট্রেট কর্তৃক আসামীর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী গ্রহণ করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এছাড়া আদালতের সংখ্যা বৃদ্ধি, বিচার ব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, অধিক সংখ্যক বিচারক, আইন কর্মকর্তা ও মধ্যস্ততাকারী নিয়োগ, উচ্চ আদালতে বেঞ্চের সংখ্যা বৃদ্ধি, অনলাইন কোর্ট, ডিজিটাল কজলিস্ট, ই-জুডিসিয়ারি গঠন ও জুডিসিয়াল রিফর্ম কশিন গঠন, বিবিধ মামলা দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তি ও মোবাইল হটলাইনে আইনী সেবা প্রদানের মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থায় গতিশীলতা আনার কথা বলা হয়েছে। দক্ষ আইনজীবী ও বিচারক তৈরির জন্য মানসম্মত ও পেশাভিত্তিক কোর্স-কারিকুলাম প্রনয়ণ করার বিষয়ে জোড় দিয়েছেন অনেকেই। এসব ব্যবস্থা যথাযথভাবে কার্যকর হলে মামলাজট বহুলাংশে কমে আসবে এবং বিচার ব্যবস্থায় আস্থা ও গতিশীলতা ফিরে আসতে পারে। এসব পদক্ষেপ কার্যকর করার জন্য সমন্বিত কর্মসূচী প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকতে হবে। এর পাশাপাশি, ক্রমাগত আদালত মূলতবি, জটিল বিচারিক প্রক্রিয়া, অনিয়ম-দুর্নীতি, সরকারের হস্তক্ষেপ, রাজনৈতিক প্রভাব, আসামী ও সাক্ষীদের হুমকি, ভূক্তভোগী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা বিধানের মাধ্যমে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব। সর্বপোরি, যুগোপযোগী ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে প্রতিটি মামলার দ্রুত ও ন্যায় বিচার নিশ্চিত করে বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার কোন বিকল্প নেই।