টেকনোলজী ডেস্ক, ২২ জুন ২০২৬ইং (ঢাকা টিভি রিপোর্ট): কারণ বিগত সরকারের সময় এক দেশ এক রেট করে ৫০০ টাকা ফ্ল্যাট রেট করে ফেলে। ওই সময় বিটিসিএল প্রিমিয়াম ক্যাটাগরির ডোমেইনকেও ৫০০ টাকায় বিক্রি করে, তখন রাজস্বে একটা বড় ক্ষতি হচ্ছিল। এর পরই পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনক্রমে দাম বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত আসে।

কোনো ধরনের আগাম বার্তা ছাড়াই কিছু ‘ডট বিডি’ (.bd) ডোমেইনকে ‘প্রিমিয়াম’ শ্রেণিবদ্ধ করে নিয়মিত দামের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি নিবন্ধন ফি এবং নবায়ন ফি নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)। শুধু মূল্যবৃদ্ধিই নয়, ডোমেইন সংক্রান্ত যে কোনো সমস্যার অভিযোগ জানাতেও গ্রাহককে ১০ হাজার টাকা গুনতে হবে বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

বিটিসিএলের এমন আকস্মিক সিদ্ধান্তে বিপাকে পড়েছেন জেলা প্রশাসনসহ সরকারি-বেসরকারি নানা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং দীর্ঘদিন ধরে এই ডোমেইন ব্যবহারকারী হাজারো গ্রাহক। এমনকি সাধারণ ক্যাটাগরির ডোমেইন কেনা অনেক প্রতিষ্ঠান হঠাৎ করে নিজেদের ডোমেইনকে প্রিমিয়াম ক্যাটাগরিতে দেখতে পান। দীর্ঘদিন ধরে এসব ডোমেইন ব্যবহারকারী জানেন না কোন মানের ভিত্তিতে তাদের ডোমেইনকে ‘প্রিমিয়াম’ ঘোষণা করা হলো।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, উচ্চমূল্যের বা ‘প্রিমিয়াম’ ডোমেইনের ক্যাটাগরি করে প্রায় ২ হাজার ডোমেইনের একটি তালিকা তৈরি করেছে বিটিসিএল, যেগুলোর নিবন্ধন ফি নির্ধারণ করেছে ২০ হাজার টাকা এবং বার্ষিক নবায়ন ফি ২৫ হাজার টাকা, কিছু ক্ষেত্রে এর চেয়েও বেশি। এ তালিকায় দেশের সব জেলার নাম, জনপ্রিয় শব্দ এবং বাণিজ্যিকভাবে আকর্ষণীয় বিভিন্ন নাম রয়েছে। কিন্তু কোন মানের ভিত্তিতে কিছু ডোমেইনকে প্রিমিয়াম ঘোষণা করা হলো তা জানে না কেউ। সঙ্গে ডোমেইন মালিকানা-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির অভিযোগ ফি ১০ হাজার টাকার সিদ্ধান্ত বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শুধু বেসরকারি গ্রাহক পর্যায় নয়, উদ্ভট এই সিদ্ধান্তের কারণে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও। জেলার নামভিত্তিক বহু ডোমেইনকে প্রিমিয়াম তালিকাভুক্ত করায় জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান কিংবা সরকারি প্রকল্পগুলোকে ভবিষ্যতে কয়েকগুণ বেশি ফি গুনতে হতে পারে। এতে দেশীয় সেবা নিয়েও অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হবে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে। বিটিসিএলের এমন অযৌক্তিক সিদ্ধান্তে সরকারি সেবা হিসেবে পরিচালিত একটি জাতীয় ডিজিটাল অবকাঠামো ব্যবহারের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থনৈতিক বাধা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন খাত বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি সম্প্রসারণের এই সময়ে ডোমেইন নিবন্ধন ও ব্যবহারকে উৎসাহিত করার পরিবর্তে এই পদক্ষেপ নতুন করে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও বেসিসের সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর কালবেলাকে বলেন, বহু বছর ধরে ব্যবহৃত একটি ডোমেইনকে হঠাৎ করে ‘প্রিমিয়াম’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করে নবায়ন ফি কয়েকগুণ বৃদ্ধি করা নীতিগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। এ ধরনের সিদ্ধান্তের কয়েকটি নেতিবাচক প্রভাব হতে পারে। যেমন, ডট বিডি ডোমেইনের প্রতি আস্থা কমে যেতে পারে। নতুন উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপরা ‘ডট বিডি’র পরিবর্তে ‘ডট কম’ (.com) বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক ডোমেইনের দিকে ঝুঁকতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি ডিজিটাল বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। এছাড়া সরকারি ডিজিটালাইজেশন ও স্থানীয় ডোমেইন ব্যবহারের প্রচেষ্টাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ডোমেইন মালিকানা-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ১০ হাজার টাকা ফি নির্ধারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, প্রশাসনিক ফি থাকা অস্বাভাবিক নয়। এতে অযৌক্তিক বা হয়রানিমূলক অভিযোগ কিছুটা কমতে পারে। উচ্চ অভিযোগ ফি স্বল্পমেয়াদে রাজস্ব বাড়াতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ডট বিডি ডোমেইনের গ্রহণযোগ্যতা ও ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সুত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ডোমেইন ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনার বিষয়টি বোর্ডে উত্থাপন করা হয়। পরে বোর্ড এসব ডোমেইনের জন্য আলাদা মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে প্রশ্ন উঠেছে, ডোমেইনের বাজারমূল্য নির্ধারণের জন্য কোনো স্বাধীন মূল্যায়ন করা হয়েছে কি না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রিমিয়াম ডোমেইনের ধারণা থাকলেও সাধারণত নতুন নিবন্ধনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মূল্য আরোপ করা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিনের ব্যবহারকারীদের হঠাৎ প্রিমিয়ামে অন্তর্ভুক্তির নিয়ম নেই। সাধারণ হিসেবে ক্রয় করা ডোমেইনের ক্ষেত্রে পরে উচ্চ নবায়ন ফি চাপিয়ে দেওয়া হলে তা বৈষম্যমূলক হয়ে উঠতে পারে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি সম্প্রসারণের এ সময়ে ডোমেইন নিবন্ধন ও ব্যবহারকে উৎসাহিত করার বদলে মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে নতুন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। একদিকে সরকার স্থানীয় কনটেন্ট ও দেশীয় ডিজিটাল পরিচয় ব্যবহারে উৎসাহ দিচ্ছে, অন্যদিকে ডট বিডি ডোমেইনের ফি কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত সেই লক্ষ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তাদের দাবি, কোন ভিত্তিতে ডোমেইনগুলোকে ‘প্রিমিয়াম’ ঘোষণা করা হয়েছে, মূল্য নির্ধারণের মানদণ্ড কী এবং এ সংক্রান্ত বোর্ডের সিদ্ধান্ত—সবকিছুই প্রকাশ করা উচিত। পাশাপাশি বিদ্যমান গ্রাহকদের স্বার্থ সুরক্ষায় দ্রুত নীতিগত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন তারা।

দেশীয় হোস্টিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এক্সন হোস্টের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সালেহ আহমেদ বলেন, ডট বিডি ডোমেইন বাংলাদেশের জাতীয় ডিজিটাল সম্পদ। বিটিসিএলের অধিকার রয়েছে কিছু শব্দকে প্রিমিয়াম হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার। তবে একজন দেশীয় ব্যবসায়ী হিসেবে বলব, যে ডোমেইন পূর্বে সাধারণ মূল্য (রেগুলার প্রাইসে) নিবন্ধিত হয়েছে, সেই ডোমেইনের ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে অভিজাত শ্রেণিতে (প্রিমিয়াম ক্যাটাগরি) স্থানান্তর করে নবায়নে অতিরিক্ত মূল্য আরোপ করা ন্যায্য বা প্রত্যাশিত ব্যবসায়িক চর্চা বলে মনে করি না। এছাড়াও নবায়ন ফি ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করায় অনেক ব্যক্তি পর্যায়ের, স্টার্টআপ ও ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে এবং নতুন গ্রাহকরা এই ডোমেইন নিতেও আগ্রহ হারাতে পারেন।

এই বিষয়ে কথা বলতে বিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে বেশ কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পরবর্তী সময়ে জনসংযোগ কর্মকর্তার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বে থাকা উপ-মহাব্যবস্থাপকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।

দাম বাড়ানোর বিষয়ে জানতে চাইলে বিটিসিএলের উপমহাব্যবস্থাপক জয়ীতা সেন রিম্পী কালবেলাকে বলেন, রাজস্ব বাড়ানোর জন্য মূলত বিটিসিএল এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারণ বিগত সরকারের সময় এক দেশ এক রেট করে ৫০০ টাকা ফ্ল্যাট রেট করে ফেলে। ওই সময় বিটিসিএল প্রিমিয়াম ক্যাটাগরির ডোমেইনকেও ৫০০ টাকায় বিক্রি করে, তখন রাজস্বে একটা বড় ক্ষতি হচ্ছিল। যদিও তখন দুই শব্দের নামগুলোকেই প্রিমিয়াম ধরা হতো। পরবর্তী সময়ে আবার যখন প্রিমিয়াম ডোমেইন কনসেপ্ট নিয়ে আলোচনা করা হয়, তখন বিটিসিএল একটা কমিটি গঠন করে বহুল প্রচলিত প্রায় ১৯০০ শব্দের একটা প্রিমিয়াম ডোমেইনের তালিকা করে। এরপরেই পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনক্রমে দাম বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত আসে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

আন্তর্জাতিকভাবে ১৯৮টি সিসিটিএলডির সঙ্গে পর্যালোচনা করে ডোমেইনের দাম, নীতিমালা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির ফি ১০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে উল্লেখ করে বিটিসিএলের এই উপমহাব্যবস্থাপক বলেন, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ভারতীয় ডোমেইন কোম্পানির সঙ্গে মিল রেখেই আমাদের এই নীতিমালা করা হয়েছে। কারণ ওদের গ্রাহকদের মানসিকতা এবং কাজের ধরনগুলো আমাদের দেশের গ্রাহকদের সঙ্গে মিলে যায়। যখন ডোমেইনের মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব হয়, এই ধরনের অভিযোগ নিয়ে আমাদের কাছে আসলে আমরা পর্যালোচনা করি এটা আমরাই সমাধান করতে পারব কি না। যখন দেখি রেগুলেটরিসহ কয়েকজন স্টেক হোল্ডারদের নিয়ে বসতে হয় তখন আমরা এই কমপ্লেইন ফি জমা দিতে বলি। আরেকটা বিষয় হচ্ছে এটা কিন্তু স্বয়ংক্রিয় না। এটা আমরা ম্যানুয়ালিই ইনভয়েস করি। তাই চাইলেই কেউ ওয়েবসাইট থেকে এই কমপ্লেইন ফি জমা দিতে পারবে না।

আমেরিকান প্রতিষ্ঠানে হোস্টিংডটকমের বাংলাদেশের অপারেশন ম্যানেজার ইমরান হোসেন কালবেলাকে বলেন, আন্তর্জাতিক যে নিয়ম মানা হয় সেটাকে বিটিসিএল কেন অনুসরণ করবে? বিটিসিএলের কাজ দেশের অবস্থা বুঝে সিদ্ধান্ত নেয়া। বহির্বিশ্বের সবাই যা করবে সেটা আমাদের জন্য ভালো না হলে তা আমাদের স্বার্থে অনুসরণ করা উচিত না। যেমন গ্লোবালি ডোমেইন কিনতে কোনো কাগজপত্রের প্রয়োজন না হলেও বাংলাদেশে নিরাপত্তার কথা বলে কাগজপত্র ছাড়া কোনো ডোমেইন তারা বিক্রি করে না।

তিনি আরও বলেন, তারা এভাবে নিজেদের স্বেচ্ছাচারিতায় রেগুলার ডোমেইনকে প্রিমিয়াম ডোমেইনের তালিকায় নিয়ে আসছে। আবার সেটা আগে থেকে কোনো গ্রাহককেও জানাচ্ছে না। এটা কোনোভাবেই আন্তর্জাতিক চর্চা হতে পারে না। গ্রাহক হিসেবে আমরা কি শুধু বিটিসিএলের আর্থিক লাভের দিক দেখবো নাকি দেশের কথা চিন্তা করব? ডট বিডির ব্যবহার বাড়ানোর কথা চিন্তা করব? আমাদের স্বার্থ কি এই প্রতিষ্ঠান দেখবে না?

এই সিদ্ধান্তের কারণে দেশীয় ডোমেইনে গ্রাহকরা আগ্রহ হারাবেন জানিয়ে ইমরান হোসেন বলেন, ‘ডটবিডি বাংলাদেশের ডিজিটাল পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু হঠাৎ কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়াই নিবন্ধন ও নবায়ন ফি কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ডোমেইনের ব্যবহার বাড়ানোর পরিবর্তে এমন সিদ্ধান্ত ব্যবহারকারীদের নিরুৎসাহিত করবে।’