সিলেট, ২১ জুন ২০২৬ইং (ঢাকা টিভি রিপোর্ট): দেশের অভ্যন্তরে টানা ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাত এবং ভারতের উজানে অবস্থিত অরুণাচল প্রদেশ ও মেঘালয়ে ভারি বর্ষণের কারণে উত্তরাঞ্চল ও সিলেট অঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর বা কাছাকাছি দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র উত্তরাঞ্চলের চার জেলা- নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও রংপুরে বন্যার শঙ্কার কথা জানিয়েছে।
নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের আবাদি জমি তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় উদ্বেগে রয়েছেন কৃষকরা। একই সঙ্গে সিলেট বিভাগেও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
টানা বর্ষণ ও ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাদাপাথরের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। প্রবল স্রোতের কারণে ধলাই ও পিয়াইন নদীর পানি বেড়েছে। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সাদাপাথরসহ আশপাশের পর্যটন এলাকায় ভ্রমণ সাময়িকভাবে বন্ধ করা হচ্ছে।
সিলেটে কয়েক দিন ধরে অব্যাহত বৃষ্টিপাতের ফলে নিম্নাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা আরও বেড়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে শনিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সিলেটে ১৪০ দশমিক ৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা চলতি মৌসুমে স্বল্প সময়ে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের অন্যতম। শনিবার সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত আরও ৩৫ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
সিলেট আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ রুদ্র তালুকদার জানান, ভারতের মেঘালয়সহ পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে কয়েক দিন ধরে ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। এর প্রভাবে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলার নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সিলেট অঞ্চলের নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে থাকলেও আগামী তিন দিনে উজানে আরও ভারি বৃষ্টিপাত হলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ বলেন, মেঘালয় পার্বত্য অঞ্চলে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলে সিলেটের নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে।
অন্যদিকে উজান থেকে নেমে আসা ঢলে তিস্তা নদীর পানিও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে। শনিবার বিকেল ৩টায় সেখানে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। আগের দিন একই সময়ে তা ছিল বিপৎসীমার ৪১ সেন্টিমিটার নিচে।
নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে লালমনিরহাটসহ তিস্তা তীরবর্তী বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলের ফসলি জমি ইতোমধ্যে পানিতে ডুবে যেতে শুরু করেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, শনিবার সকাল ৯ টায় লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপচেলার দোয়ানী তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্টে নদীর পানি রেকর্ড করা হয়েছে ৫২ দশমিক ২ মিটার। এ পয়েন্টে পানির বিপৎসীমা ৫২ দশমিক ১৫ মিটার। গতকাল শুক্রবার (১৯ জুন) সকাল ৯ টায় এ পয়েন্টে পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছিল ৫১ দশমিক ৬৪ মিটার।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যারেজের ৪৪ জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, গজলডোবা ব্যারেজের ২০টি গেট ভারত খুলে দেয়ায় তিস্তার পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি চলে এসেছে। এতে চরের অনেক কৃষকের আবাদি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় দেশের রংপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক স্থানে ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। একই সঙ্গে দমকা হাওয়া, বজ্রপাত এবং বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে।
আবহাওয়াবিদ শাহীনুল ইসলাম বলেন, গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ থেকে উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত লঘুচাপের বর্ধিতাংশ বিস্তৃত রয়েছে। এর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আগামী অন্তত তিন দিন ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।
এ ছাড়া টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও সিলেট অঞ্চলে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে অস্থায়ী দমকা বা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সংশ্লিষ্ট নদীবন্দরগুলোকে এ কারণে সতর্কসংকেত মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।