ঢাকা, ১২ জুন ২০২৬ইং (ঢাকা টিভি রিপোর্ট): আজ শুক্রবার (১২ জুন) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, গত ১৭ বছরে স্থল ও সমুদ্র এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে দেশ ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে চলে গেছে। দেশে জ্বালানি খাতে আমদানি নির্ভরতা কমাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি) আরও সক্রিয় করা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী বলেন, বাপেক্সের সফলতার ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটিকে প্রায় নিষ্ক্রিয় করে ফেলা হয়েছিল। দায়িত্ব গ্রহণের পর জ্বালানি খাতের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বাপেক্সকে পুনরুজ্জীবিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ জন্য প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা বাড়াতে আরও পাঁচটি রিগ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, সমুদ্রসীমা বিজয়ের পর প্রতিবেশী দেশগুলো সংশ্লিষ্ট এলাকায় গ্যাস উত্তোলন ও রপ্তানি শুরু করলেও বাংলাদেশে এ খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলোকে সমুদ্র এলাকায় অনুসন্ধানের জন্য আহ্বান জানিয়ে দরপত্র ডাকা হয়েছে। এক মাস পর দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হলে নির্বাচিত কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে ব্লক বরাদ্দ দেওয়া হবে। গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে বাপেক্সের অভিজ্ঞতা না থাকায় বিদেশি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করতে হবে। তবে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা অব্যাহত থাকবে।

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার কারণে কাতার ও সৌদি আরবের সঙ্গে বিদ্যমান কিছু সরবরাহ চুক্তিতে ‘ফোর্স মেজর’ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলেও জানান তিনি। এ কারণে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে প্রায় আড়াই বিলিয়ন ডলারের তেল কেনা হয়েছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

জ্বালানি মন্ত্রী বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানি সংকট দেখা দিলেও বাংলাদেশে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। তবে বিদ্যুৎ খাতে অতীতে উচ্চমূল্যে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনে ভোক্তাদের কাছে কম দামে বিক্রি করায় বড় ধরনের ভর্তুকির চাপ তৈরি হয়েছে। এর ফলে একদিকে লোকসান হচ্ছে, অন্যদিকে শিল্প উৎপাদন সচল রাখতে বিদ্যুৎ সরবরাহও বজায় রাখতে হচ্ছে।

তিনি জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারকে প্রথমেই বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া ৫৬ হাজার কোটি টাকা পরিশোধের চাপ মোকাবিলা করতে হয়েছে। এর পাশাপাশি চলমান বিল পরিশোধের দায়ও রয়েছে, যা অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ব্যয় কমানোর উদ্যোগ হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। ২০৩০ সালের মধ্যে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বাস্তবে এর চেয়েও বেশি উৎপাদন সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ইউরোপীয় দেশগুলো ইতোমধ্যে তৈরি পোশাক খাতের জন্য পরিবেশগত মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছে। অন্তত ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ব্যবহার না করলে রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্ক বৃদ্ধি বা অন্যান্য বিধিনিষেধের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ফলে সৌরবিদ্যুতের দিকে অগ্রসর হওয়া বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ সরবরাহে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে ব্যাটারিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্য সামনে রেখে প্রস্তাবিত বাজেটে সৌরবিদ্যুৎ খাতে ব্যবহৃত ব্যাটারিসহ সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক ও কর ছাড় দেওয়া হয়েছে।

সরকারের এসব উদ্যোগের সুফল পেতে কিছুটা সময় প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা মাত্র কয়েক মাস দায়িত্বে আছি। আশা করছি, আগামী দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যে এসব উদ্যোগের দৃশ্যমান ফল জনগণ দেখতে পাবে।

সংবাদ সম্মেলনে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, শিক্ষা মন্ত্রী আ. ন. ম. এহসানুল হক, অর্থ প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, অর্থসচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।