ঢাকা, ১২ জুন ২০২৬ইং (ঢাকা টিভি রিপোর্ট): আজ শুক্রবার (১২ জুন) বাজেটের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেছেন, দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করে শিল্প ও বিনিয়োগকে এগিয়ে নিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট সন্তোষজনক।

তিনি আরো বলেছেন, তৈরি পোশাক শিল্পের দুটি প্রধান প্রত্যাশা—করব্যবস্থার সংস্কার এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের প্রেক্ষাপটে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার আমদানি সহজীকরণ—দুই ক্ষেত্রেই বাজেটে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুৎ খাতে কর সুবিধা সম্প্রসারণ এবং মধ্যমেয়াদি নীতিকাঠামোর দিকে অগ্রসর হওয়ার মতো বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ রয়েছে। এসব পদক্ষেপের জন্য তিনি সরকার, অর্থমন্ত্রী এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানকে ধন্যবাদ জানান।

মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শিল্পখাতের দীর্ঘদিনের একটি দাবি ছিল উৎসে কর্তিত অগ্রিম আয়কর (এআইটি) সমন্বয়, বহন বা ফেরতের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা চালু করা। ফেরত অর্থ চেক বা অন্য কোনো ইনস্ট্রুমেন্টাল ফর্মে দেওয়া যেতে পারে, যা প্রয়োজনে অন্যান্য সরকারি পাওনার সঙ্গে সমন্বয়ের সুযোগ থাকবে। তবে বিষয়টি আরও স্পষ্ট করা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, উৎসে অগ্রিম কর কেটে নেওয়ার পর সময়মতো সমন্বয় বা ফেরত না হলে ব্যবসার কার্যকর মূলধন আটকে যায়। ফলে তারল্য সংকট তৈরি হয়, ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ে এবং শিল্পের টেকসই প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। দীর্ঘদিন ধরেই শিল্প উদ্যোক্তারা এ সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।

বিকেএমইএ সভাপতি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা, মাউন্টিং স্ট্রাকচার এবং সংশ্লিষ্ট উপকরণের ওপর কর সুবিধা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, দেশের বিদ্যমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এটি একটি গঠনমূলক পদক্ষেপ। এ প্রস্তাব বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করায় এনবিআর ও অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, রপ্তানিমুখী নন-বন্ডেড প্রতিষ্ঠানকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি এবং দেশীয় বন্ডেড প্রতিষ্ঠান থেকে কাঁচামাল সংগ্রহের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত রপ্তানি বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

মোহাম্মদ হাতেম বলেন, রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বিদ্যমান সুবিধাগুলো বহাল রাখা এবং বিভিন্ন প্রণোদনা ও নীতিগত সুবিধার মেয়াদ তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা গ্রহণে সহায়তা করবে।

তবে তিনি পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবার আমদানির ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ কর আরোপের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান। তার ভাষ্য, বর্তমানে দেশে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান এ পণ্য উৎপাদন করে, যা মোট চাহিদার ১০ শতাংশেরও কম পূরণ করতে সক্ষম। দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও তা করতে গিয়ে রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে বাজার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বিকেএমইএ সভাপতি বলেন, দেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে বাজেটে পর্যাপ্ত ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের ঘাটতি রয়েছে। শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এটি এখনও অন্যতম বড় বাধা। সৌরবিদ্যুৎ আংশিক সমাধান দিলেও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধানের জন্য দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো জরুরি।

তিনি উচ্চ ঋণসুদের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ঋণের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা পরিচালনা করা সম্ভব নয়।

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশকে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিবেশী অনেক দেশ শিল্পভূমি, মূলধন সহায়তা, শ্রমিক মজুরি সহায়তা এবং রপ্তানি প্রণোদনাসহ নানা সুবিধা দিচ্ছে। নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশকেও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান বজায় রাখতে হবে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে বাজেটে কিছু আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন বিকেএমইএ সভাপতি। বিশেষ করে সংকটে থাকা ও বন্ধ কারখানাগুলোর জন্য সহায়তা কর্মসূচি শিল্প উৎপাদন পুনরুদ্ধার এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

সামগ্রিক মূল্যায়নে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, নীতিগত দিক থেকে বাজেট ইতিবাচক। তবে এর প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সহজ ও কার্যকর প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে এসব উদ্যোগ বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্প পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।