মোঃ নূরুল ইসলাম-কমলনগর উপজেলা প্রতিনিধি (লক্ষীপুর), ০৮ মে ২০২৬ইং (ঢাকা টিভি রিপোর্ট): লক্ষ্মীপুরের কমলনগর, রামগতি ও রায়পুর উপজেলাজুড়ে সরকারি বিভিন্ন ভাতা ও ঘর পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রায় ৭০-৮০ লক্ষ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে। চক্রের মূলহোতা তাহমিনা আক্তার লিমা নিজেকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। বর্তমানে তিনি এলাকা ছেড়ে ঢাকায় আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত তাহমিনা আক্তার লিমা বিভিন্ন গ্রামে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিজেকে সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা পরিচয় দিতেন। তিনি দাবি করতেন, তার মাধ্যমে খুব সহজেই সরকারি ঘর, শিশু ভাতা, বয়স্ক ভাতা ও মাতৃত্বকালীন ভাতাসহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পাওয়া যাবে। তার কথায় বিশ্বাস করে স্থানীয় সহজ-সরল মানুষ জনপ্রতি হাজার হাজার টাকা তার হাতে তুলে দেন।

ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে শিশু ভাতার জন্য ৪ হাজার টাকা, বয়স্ক ভাতার জন্য ৪ হাজার টাকা, মাতৃত্বকালীন ভাতার জন্য ৫ হাজার টাকা এবং টয়লেট নির্মাণের নামে ১ হাজার ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়। টাকা নেওয়ার সময় দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে সরকারি সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও সাত-আট মাস পেরিয়ে গেলেও কেউ কোনো সুবিধা পাননি। পরে টাকা ফেরত চাইলে শুরু হয় নানা টালবাহানা।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রতারণার ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর অভিযুক্ত লিমার ছোট ভাই মোঃ তানভীর হোসেন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছ থেকে দুই মাস সময় নেন। তিনি আশ্বাস দেন, যেভাবেই হোক দুই মাসের মধ্যে সকলের টাকা ম্যানেজ করে ফেরত দেওয়া হবে। কিন্তু সেই সময়ের মধ্যেই তিনি তার বড় ভাই তারেক হোসেনকে বিদেশে পাঠিয়ে দেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে প্রতারিত পরিবারগুলোর মাঝে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।

এদিকে মূল অভিযুক্ত তাহমিনা আক্তার লিমা বর্তমানে ঢাকায় আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা। দীর্ঘদিন ধরে তিনি এলাকায় আসছেন না। স্থানীয়দের দাবি, এত বড় অংকের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ থাকার পরও তিনি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন— এত বড় একটি প্রতারণার ঘটনার পরও প্রশাসন কেন এখনো মূলহোতাকে গ্রেফতার করতে পারেনি?

এ ঘটনায় আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, নিজেদের রক্ষা করতে এবং মূল ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে প্রতারক চক্রটি কয়েক ব্যক্তির বিরুদ্ধে আদালতে একটি মামলা দায়ের করেছে। তবে এখন পর্যন্ত ওই মামলার কোনো তদন্ত প্রতিবেদন বা গ্রহণযোগ্য অগ্রগতি পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে।

এছাড়া যে মামলায় একাধিক ব্যক্তিকে সাক্ষী করা হয়েছে, তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা এ মামলা সম্পর্কে কিছুই জানেন না। এমনকি কেউ কেউ দাবি করেছেন, তাদের অনুমতি ছাড়াই সাক্ষী হিসেবে নাম ব্যবহার করা হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, আমরা কোনো ঘটনা জানি না, কোনো কাগজেও স্বাক্ষর করিনি। কীভাবে আমাদের নাম সাক্ষী হিসেবে গেল সেটাও জানি না।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, প্রতারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের টাকা আত্মসাতের পর এখন একটি সংঘবদ্ধ চক্র নিজেদের রক্ষায় নানা কৌশল অবলম্বন করছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, প্রতারক চক্রটি পরিকল্পিতভাবে মানুষকে ভয়ভীতি দেখানো, মিথ্যা মামলা দেওয়া এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা করছে।

ভুক্তভোগী শাহনাজ বেগম বলেন, আমাদের অনেক স্বপ্ন দেখিয়ে গ্রামের সহজ-সরল মানুষের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা নিয়ে তারা পালিয়ে গেছে। এখন টাকা চাইতে গেলে কেউ খোঁজও নেয় না। উল্টো মিথ্যা মামলা দিয়ে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে। আমরা প্রশাসনের কাছে দ্রুত বিচার চাই।

এই ঘটনায় রামগতি উপজেলার পূর্ব চর সীতা গ্রামের মনির আহমেদের মেয়ে শাহনাজ বেগম বাদী হয়ে লক্ষ্মীপুর আদালতে একটি মামলা দায়ের করেছেন (সিআর মামলা নং-১০২, তারিখ: ১৬/০৩/২০২৬ ইং)। স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসন দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে মূলহোতাসহ জড়িত সকলকে আইনের আওতায় আনুক এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর টাকা উদ্ধারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করুক। বর্তমানে প্রতারিত শত শত পরিবার তাদের কষ্টার্জিত অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন।