ঢাকা, ১৭ এপ্রিল ২০২৬ইং (ঢাকা টিভি রিপোর্ট): আজ শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) রাজধানীর মগবাজারে আল ফালাহ মিলনায়তনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ‘জেলা আমির সম্মেলন’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, যেদিন গণভোটের গণরায়কে অস্বীকার করা হয়েছে, সেদিন থেকেই নতুন ফ্যাসিবাদের যাত্রা শুরু হয়েছে। আর এই ফ্যাসিবাদ অতীতের ফ্যাসিবাদের চেয়েও ভয়ংকর রূপ ধারণ করছে।
ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি নিরপেক্ষ বডি গঠনের জন্য অধ্যাদেশ জারি করা হলেও তা ঠেকিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে দলীয় প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। দলীয় ভিত্তিতে বিচারক নিয়োগের ফলে বিচারপতি খায়রুল হক, বিচারপতি শামসুদ্দিন মানিক এবং শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ বিচারপতি এনায়েতুর রহিমের মতো ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এ ধরনের নিয়োগের কুফল দেশবাসী ভোগ করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) গঠনের অধ্যাদেশও ঠেকিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, অতীতের ফ্যাসিবাদের চেয়ে আগামীর ফ্যাসিবাদ আরও ভয়াবহ হবে।
জ্বালানি সংকট প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় সংসদ ও সংসদের বাইরে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করা উচিত ছিল। কিন্তু সে ধরনের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। বরং বলা হচ্ছে দেশে তেলের কোনো সংকট নেই, কিছু লোক তেল মজুত করে চোরাই পথে বিক্রি করছে। এ ধরনের বক্তব্যকে তিনি সরকারের ব্যর্থতা উল্লেখ করে বলেন, এতে ভুক্তভোগী মানুষের কষ্ট আরও বাড়ছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, জনগণ কি জানে না কোথা থেকে তেলের ড্রাম উদ্ধার হচ্ছে? জ্বালানি সংকট না থাকলে প্রতিদিন ৬ থেকে ১০ ঘণ্টা লোডশেডিং কেন হচ্ছে— সে প্রশ্নও তোলেন তিনি। এসব বক্তব্যকে তিনি পরস্পরবিরোধী ও মিথ্যাচার বলে উল্লেখ করেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণতান্ত্রিক যত প্রতিষ্ঠান আছে, সব ধ্বংসের পাঁয়তারা করা হচ্ছে। ক্রিকেট বোর্ডের মতো একটি প্রতিষ্ঠানেও লোভ সামলাতে পারেনি। সেখানে কেউ বাপের তালিকায়, কেউ স্বামীর তালিকায়, কেউ অপেক্ষমাণ তালিকায় ছিল আর তিনি ছিলেন ভাইয়ের তালিকায়। এভাবে ক্রিকেট বোর্ডটিকে পর্যন্ত দলীয়করণ করে ফেলা হয়েছে। সিভিল প্রশাসনে যে লোকগুলো সৎ ও দক্ষ, তাদের ডাম্পিং প্লেসে ওএসডি করা হচ্ছে অথবা কোনো খারাপ জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাদের মেধা থেকে জনগণকে বঞ্চিত করা হচ্ছে এবং তাদের ওপর জুলুম করা হচ্ছে। সব দিকেই একটি মহা নৈরাজ্য তৈরি করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের দ্রুত পরিবর্তন করা হচ্ছে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে এবং মানবাধিকার কমিশন পদত্যাগ করে খোলা চিঠি দিয়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, বিচারকদের স্বাধীন বলা হলেও তাদের ওপর হস্তক্ষেপ করে ২৮ জন বিচারককে শোকজ করা হয়েছে। অথচ তারাই বলে বিচারকরা স্বাধীন। যদি তারা স্বাধীনই হয়ে থাকে, তাহলে তাদের ওপর আপনারা ছড়ি ঘোরান কেন?
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড ও হেলথ কার্ড বিতরণ করা হলেও এসব কার্যক্রমে দলীয়করণের অভিযোগ রয়েছে। তিনি একটি ঘটনার উল্লেখ করে বলেন, এক বিধবাকে কার্ড দেওয়ার কথা বলে তার জীবন নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। দেশে চাঁদাবাজির হার দিন দিন বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ। জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত চাঁদার কারণে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকার দুর্নীতি দমন করার কথা বললেও বাস্তবে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে এবং সমাজের সৎ মানুষদের নীরব করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার ভুলের মধ্যে রয়েছে এবং তাদের উচিত সেই ভুল থেকে বেরিয়ে আসা। তিনি গণভোটের ফলাফল মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান এবং বলেন, ফ্যাসিবাদমুক্ত শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে ইতিবাচক উদ্যোগে সহযোগিতা করা হবে, তবে জনগণের ওপর ফ্যাসিবাদ কায়েমের কোনো প্রচেষ্টা মেনে নেওয়া হবে না।