ঢাকা, ১১ এপ্রিল ২০২৬ইং (ঢাকা টিভি রিপোর্ট): খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সাধারণ অধিবেশন ২০২৬-এ ৫টি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। অধিবেশনে নেতৃবৃন্দ দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণভোট অধ্যাদেশ বাতিল, সংবিধান সংস্কার, জ্বালানি খাতের অস্থিরতা, স্বাস্থ্যখাতের অবনতি ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। আজ শনিবার (১১ এপ্রিল) সকাল ৯টায় কাইকরালস্থ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে দলের আমির মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদের সভাপতিত্বে ও মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদেরের পরিচালনায় এ মজলিসে শুরা অনুষ্ঠিত হয়।
শুরায় নেতৃবৃন্দ বলেন, বিএনপি সরকার গণভোট অধ্যাদেশ-২০২৫, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশ, মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশ ও বিচার বিভাগ সংস্কার অধ্যাদেশসহ বেশ কয়েকটি জনগুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল করে দেশকে পুনরায় ফ্যাসিবাদী শাসনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে গণভোট অধ্যাদেশ বাতিলের মাধ্যমে সরকার গণবিরোধী অবস্থান নিয়েছে বলেও তারা মন্তব্য করেন।
মজলিসনেতারা বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫’কে ‘অন্তহীন প্রতারণার দলিল’ ও ‘জাতীয় প্রতারণা’ হিসেবেও আখ্যায়িত করেছে।
নেতারা অভিযোগ করেন, এর মাধ্যমে বিএনপি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ভূলুণ্ঠিত করেছে। অথচ ওই সনদে স্বাক্ষরকারী ২৫টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিএনপির নামও রয়েছে। পরবর্তীতে তারা ভিন্নমত যুক্ত করে সংসদীয় পদ্ধতিতে সংশোধনের কথা বলছে, যা গণভোটে প্রদত্ত জনরায়ের বিরোধী বলেও উল্লেখ করা হয়।
অধিবেশনে দেশের স্বাস্থ্যখাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। যথাসময়ে টিকা প্রদান না করায় শিশুদের মধ্যে হাম রোগের সংক্রমণ বেড়েছে এবং গত মার্চ মাসে এ রোগে ৩২ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার সম্ভাব্য প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় সরকারের প্রস্তুতির অভাব নিয়েও সমালোচনা করা হয়। সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জামের সংকটে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
এ ছাড়া জ্বালানি খাতে অস্থিরতা, তেল মজুদদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সপ্তাহে তিনদিন অনলাইন ক্লাস চালুর সিদ্ধান্তকে অপরিণামদর্শী উল্লেখ করে তা প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়। বগুড়া-৬ ও শেরপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহিতা দাবি করা হয়।
অধিবেশনে প্রস্তাব গ্রহণ ছাড়াও কেন্দ্রীয় বার্ষিক রিপোর্ট পেশ ও পর্যালোচনা, বার্ষিক পরিকল্পনা পুনর্মূল্যায়ন এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০২৬ বিষয়ে আলোচনা করা হয়।
গৃহীত প্রস্তাবসমূহ
প্রস্তাব ১ : শোক প্রস্তাব
অধিবেশনে বিভিন্ন অঙ্গনের প্রখ্যাত আলেম, মজলিসনেতা, বুদ্ধিজীবী ও সাম্প্রতিক বিভিন্ন দুর্ঘটনা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিহতদের প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করা হয়। নিহতদের মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়।
প্রস্তাব ২ : গণভোট ও জুলাই সনদ প্রসঙ্গ
গণভোটসহ জনগুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিলের সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করা হয়। একইসঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানানো হয়।
প্রস্তাব ৩ : জ্বালানি খাত
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার প্রেক্ষাপটে জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে উল্লেখ করে সিলিন্ডার গ্যাসের দাম কমানো, জ্বালানি তেল বিতরণে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং বিকল্প জ্বালানির ওপর জোর দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
প্রস্তাব ৪ : স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য ও আইন-শৃঙ্খলা
স্থানীয় সরকার নির্বাচন দ্রুত আয়োজন, স্বাস্থ্যখাতে স্থবিরতা দূরীকরণ, নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।
প্রস্তাব ৫ : আন্তর্জাতিক ইস্যু
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত, ইরানে হামলা, ফিলিস্তিন ইস্যু, রোহিঙ্গা সমস্যা ও ভারতে মুসলিম নির্যাতনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।
মজলিসে শুরার সাধারণ অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন নায়েবে আমির মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন, মাওলানা আহমদ আলী কাসেমি, অধ্যাপক সিরাজুল হক, মাওলানা সাইয়্যেদ ফেরদাউস বিন ইসহাক, মুফতি আবদুল হামিদ, সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব এডভোকেট জাহাঙ্গীর হোসাইন, কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ডা. আবদুল্লাহ খান, ড. ইউসুফ আলী, মুফতি আবুল হাসান এমপি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের অন্যান্য সদস্যবৃন্দ, কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্যবৃন্দ ও আমন্ত্রিত সদস্যবৃন্দ।