ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক, ১২ জানুয়ারী ২০২৬ইং (ঢাকা টিভি রিপোর্ট): ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে চরম সহিংস পথ বেছে নিয়েছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে তাজা গুলি ছোড়া হচ্ছে। টানা ১৫ দিন ধরে চলা এই আন্দোলনে প্রাণহানির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েই চলেছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইরানি মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) রবিবার (১১ জানুয়ারি) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আন্দোলন শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৫৩৮ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ১০ হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সংস্থাটির দাবি, ইন্টারনেট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় প্রকৃত হতাহত ও গ্রেপ্তারের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।

 

গত তিন দিন ধরে ইরানে ইন্টারনেট, মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং আন্তর্জাতিক কল পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। ফলে দেশের ভেতরের পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। রাজধানী তেহরানের বড় বড় হাসপাতালগুলোর মর্গে জায়গা না থাকায় নতুন মরদেহ নিতে অস্বীকৃতি জানাতে বাধ্য হচ্ছে কর্তৃপক্ষ।

 

হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বরাতে জানা গেছে, নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে আহত ও নিহতদের ভিড়ে হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের জায়গা নেই। মর্গে স্থান সংকুলান না হওয়ায় হাসপাতাল প্রশাসন চরম অসহায় অবস্থার মুখে পড়েছে।

 

এদিকে ইরান সরকার এখন পর্যন্ত হতাহতের কোনো আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) নিহতের সংখ্যা যাচাইয়ের চেষ্টা করলেও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায় তা সম্ভব হয়নি। দিন যত গড়াচ্ছে, রাজপথে আন্দোলনের তীব্রতা ও সহিংসতার মাত্রাও তত ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, এই গণবিক্ষোভের মূল কারণ ইরানের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও মুদ্রার চরম অবমূল্যায়ন। বর্তমানে ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের মান নেমে এসেছে ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫-এ, যা একে বিশ্বের অন্যতম দুর্বল মুদ্রায় পরিণত করেছে। লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতির কারণে খাদ্য, বাসস্থান ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

 

গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের বাজারের ব্যবসায়ীরা উচ্চমূল্যস্ফীতির প্রতিবাদে যে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলেন, তা দ্রুত ৩১টি প্রদেশের শহর ও গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। এতে কার্যত অচল হয়ে পড়ে গোটা দেশ। শুরুতে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদ হলেও এখন বিক্ষোভকারীরা বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন।

 

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এই বিক্ষোভ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরু থেকেই বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছেন এবং হুঁশিয়ারি দিয়েছেন—সরকার যদি নিষ্ঠুর দমন-পীড়ন চালায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযানের পথে যেতে পারে।

 

অন্যদিকে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান রোববার দেওয়া এক ভাষণে দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, তার সরকার জনগণের অভিযোগ শোনার জন্য প্রস্তুত। তবে সরকারের এই আশ্বাসে আস্থা রাখছেন না আন্দোলনকারীরা। তারা এখনো রাজপথে অনড় অবস্থানে থেকে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।

 

এরআগে ফারদিস, কারাজ এবং পূর্ব তেহরানের আলঘাদির হাসপাতাল থেকে পাঠানো ভিডিওতেও মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা গেছে। যা নির্দেশ করছে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট শহরেই কঠোর দমন চলছে না, যেখানেই বিক্ষোভ চলছে সেখানেই গুলি ছোড়া হচ্ছে।

 

ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন থাকায় পুরো চিত্র ওঠে আসছে না উল্লেখ করে সংবাদমাধ্যমটি বলেছে, যেসব তথ্য আসছে সেগুলো বিশ্লেষণ করে বলা যায় বহু জায়গায় প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে।

 

উত্তরাঞ্চলের শহর রাশতের এক চিকিৎসক ইরান ইন্টারন্যাশনালকে জানিয়েছেন শুধুমাত্র একটি হাসপাতালেই অন্তত ৭০টি মরদেহ আনা হয়েছে।

 

সূত্র জানিয়েছে, তেহরানের বিভিন্ন অংশ এবং কারাজের ফাদরিসে সবচেয়ে বেশি সহিংসতা হচ্ছে। এছাড়া অন্যান্য জায়গা থেকেও বিক্ষোভকারীদের ওপর ব্যাপক হারে গুলি ছোড়ার তথ্য আসছে।