পুনর্মূল্যায়নের ভিত্তিতে পাঁচটি করবর্ষের বকেয়া কর আদায়ের জন্য হাইকোর্ট যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তা স্থগিত করেছেন আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত। গ্রামীণ কল্যাণের করা পৃথক দুটি লিভ টু আপিলের শুনানিতে আজ রোববার চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হক এই আদেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষের তথ্যানুযায়ী, ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ করবর্ষ পর্যন্ত গ্রামীণ কল্যাণের কাছে মোট ৬৬৬ কোটি টাকা কর দাবি করা হয়েছে। পুনর্মূল্যায়নের পর ২০১২-১৩, ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭—এসব করবর্ষের বিপরীতে প্রদেয় কর দাবি ঘিরে কর কমিশনারের সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে গ্রামীণ কল্যাণের করা পৃথক দুটি রিট খারিজ (রুল ডিসচার্জ) করে গত ১০ সেপ্টেম্বর রায় দেন হাইকোর্ট।
আদালত একই সঙ্গে হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে গ্রামীণ কল্যাণের করা পৃথক দুটি লিভ টু আপিল শুনানির জন্য আগামী ১৩ ডিসেম্বর দিন ধার্য করেছেন। এই সময়ের মধ্যে বকেয়া কর আদায়ের ক্ষেত্রে আর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাবে না। গ্রামীণ কল্যাণের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচিত অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। যেহেতু তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, সুতরাং রায়টি ডিফেকটিভ (ক্রটিপূর্ণ) হবে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যায়, কর কমিশনারের সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গ্রামীণ কল্যাণ ২০১৭ সালে দুটি পৃথক রিট দায়ের করেছিল। প্রাথমিক শুনানির পর হাইকোর্ট রুলসহ আদেশ দেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৩ সালের ১৭ অক্টোবর হাইকোর্ট রায় প্রদান করেন, যেখানে কর কমিশনারের আদেশ বাতিল করা হয় এবং বিলম্ব মার্জনা করে শর্তসাপেক্ষে আইন অনুসারে ৬০ দিনের মধ্যে আপিল করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তীতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সেই রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করলে ২০২৪ সালের ১১ মার্চ আপিল বিভাগ নতুন করে হাইকোর্টে পুনঃ শুনানির নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী, বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ গত ১০ সেপ্টেম্বর রিট দুটি খারিজ করে রায় ঘোষণা করেন। এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি ১২ অক্টোবর প্রকাশিত হয়।
পূর্ণাঙ্গ রায়ের ১৫ পৃষ্ঠার অংশে নোটিশের মাধ্যমে এবং ৩২ পৃষ্ঠার অংশে বকেয়া কর আদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। রায়ের পর গ্রামীণ কল্যাণ আপিল বিভাগের শরণাপন্ন হয়। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন ও রাষ্ট্রপক্ষের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মেহেদি হাসান নিশ্চিত করেছেন যে, আপাতত বকেয়া কর আদায়ের নির্দেশটুকু স্থগিত করা হয়েছে। দুটি রিটের একটিতে দেওয়া রায় ১৫ পৃষ্ঠার, অপরটি ৩২ পৃষ্ঠার। ৩২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের শেষাংশে আইন অনুযায়ী যত দ্রুত সম্ভব রিট আবেদনকারীর (গ্রামীণ কল্যাণ) কাছ থেকে বকেয়া কর আদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ঢাকার সংশ্লিষ্ট কর কমিশনারসহ বিবাদীদের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়।
এর আগে, এই মামলাগুলোর বিচারিক প্রক্রিয়ায় কিছু পরিবর্তন দেখা যায়। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ রুল খারিজ করে রায় দিলেও ২৯ আগস্ট তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছিল। কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, ওই বেঞ্চের দ্বিতীয় বিচারক অতীতে কোনো এক সময় সরকারপক্ষে এই মামলায় ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এই ত্রুটিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরির পর মামলার নথি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়।
পরবর্তীতে প্রধান বিচারপতি গত ১৩ মে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়ার নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে পাঠান। সেই বেঞ্চের রায় এবং তৎপরবর্তী হাইকোর্টের নির্দেশনা এখন আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতের মাধ্যমে স্থগিত হলো। আগামী ১৩ ডিসেম্বর আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে এই মামলার চূড়ান্ত শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
Leave a Reply