রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১৬ অপরাহ্ন

আইএমএফ ও বাংলাদেশ: ঋণ, সংস্কার ও নীতি নির্ধারণী স্বাধীনতার

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২৯ সময় দেখুন

বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সম্পর্ককে কেবল ঋণ গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের একক চশমায় দেখলে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র ধরা পড়ে না। এই সম্পর্কের মূল ভিত্তি ছড়িয়ে আছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের স্থিতিশীলতা, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল রাজস্ব আহরণ কাঠামোর আধুনিকায়ন, ব্যাংকিং খাতের পুঞ্জীভূত সমস্যা নিরসন, সরকারি ব্যয়ের জবাবদিহিতা, বৈদেশিক ঋণের ভারসাম্য রক্ষা, বেসরকারি বিনিয়োগের বিকাশ এবং সর্বোপরি অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে জাতীয় সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার ওপর। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাথে সাম্প্রতিক আলোচনায় সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারার ঘটনাটি দেশের জন্য যেমন গভীর চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে, তেমনি নীতি নির্ধারণে স্বাবলম্বী হওয়ার একটি বড় সম্ভাবনাও সৃষ্টি করেছে। এর উত্তর শুধু বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতির মধ্যে খুঁজলে চলবে না। এখানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের অর্থায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আস্থার সংকেত। একটি দেশ যখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে সংস্কার কর্মসূচিতে যায়, তখন অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরাও দেশটির অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দিকে নতুন করে নজর দেয়। তাই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা মানেই অন্য সব বৈদেশিক অর্থায়নের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়, কিন্তু এর ফলে আন্তর্জাতিক আস্থার পরিবেশে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। জনগণের কাছে এর ব্যাখ্যা দেওয়া এবং এর বোঝা ন্যায্যভাবে বণ্টন করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এই জায়গাটিতেই বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। যে সংস্কার বাংলাদেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করবে, তা নিজের প্রয়োজনেই গ্রহণ করা উচিত। কিন্তু কোন সংস্কার কখন এবং কী গতিতে করা হবে, তার সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতা, সামাজিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। ইসলামী অর্থনৈতিক দর্শনের আলোতেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রীয় অর্থ ও জনগণের সম্পদ একটি আমানত। সুতরাং সরকারি ব্যয়ে অপচয়, দুর্নীতি, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প কিংবা অদক্ষ ব্যবস্থাপনা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি কেবল ঘাটতি পূরণের জন্য ক্রমাগত বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতাও টেকসই হতে পারে না। গ্রিস, আর্জেন্টিনা কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতা দেখলেও বিষয়টি পরিষ্কার হয়। এতে সরকার সংস্কারের গতি ও ক্রম নির্ধারণে কিছুটা বেশি স্বাধীনতা পেতে পারে। বিশেষ করে রাজস্ব সংস্কারের ক্ষেত্রে সাধারণ ভোক্তার ওপর করের বোঝা বাড়ানোর পরিবর্তে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি বন্ধ, বড় করদাতাদের কাছ থেকে ন্যায্য রাজস্ব আদায় এবং কর প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো বেশি কার্যকর হতে পারে। আমানতকারীর অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও ব্যাংক ব্যবস্থাপনার একটি মৌলিক দায়িত্ব।

ঐতিহাসিক সদস্যপদ ও অর্থনৈতিক যাত্রার প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশের স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সাথে সংযুক্ত হওয়ার তাগিদ তৈরি হয়। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ১৯৭২ সালের ১৭ আগস্ট আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সদস্যপদ লাভ করে। গত পাঁচ দশকে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সময়ে কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, শিল্প ও রপ্তানি বাণিজ্য সম্প্রসারিত হয়েছে, দারিদ্র্যের হার কমেছে এবং সার্বিকভাবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সক্ষমতা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হয়েছে। তবে অর্থনৈতিক অবকাঠামোর এই অভাবনীয় প্রবৃদ্ধির পরও সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় কিছু গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা থেকে গেছে, যা পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন সংকট তৈরি করছে।

সাম্প্রতিক ঋণ কর্মসূচি ও এর মূল শর্তসমূহ

অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা এবং কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার লক্ষ্যে ২০২৩ সালে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কাছ থেকে মোট ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি বিশাল সহায়তা কর্মসূচি গ্রহণ করে। এই ঋণ সহায়তার একটি বড় অংশ, অর্থাৎ প্রায় ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার প্রদান করা হয় বর্ধিত ঋণ সুবিধা (ইসিএফ) ও বর্ধিত তহবিল সুবিধায় (ইএফএফ)। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলা এবং পরিবেশগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে রেসিলিয়েন্স অ্যান্ড সাস্টেইনেবিলিটি ফেসিলিটির (আরএসএফ) আওতায় আরও ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেয়া হয়। এই ঋণ সহায়তার অন্যতম মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে পুনরায় শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানো এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল নিজেও এখন তার পুরোনো পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে ভাবছে।

বাজেট ঘাটতি ও অনুৎপাদনশীল ব্যয়ের নেতিবাচক প্রভাব

জাতীয় বাজেটে আয় ও ব্যয়ের দীর্ঘদিনের সামঞ্জস্যহীনতা বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল দুর্বলতাগুলোর একটি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব সংগ্রহে বারবার ব্যর্থ হওয়ায় বাজেট ঘাটতি ক্রমাগত বাড়ছে। এর পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ের একটি বড় অংশ সুনির্দিষ্ট ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগের পরিবর্তে বিভিন্ন অনুৎপাদনশীল খাত ও ভরতুকিতে খরচ হয়ে যায়, যা মূল অর্থনীতিতে কোনো দীর্ঘমেয়াদি যোগসূত্র তৈরি করতে পারে না। রাজস্ব আদায়ের হার জিডিপির তুলনায় আন্তর্জাতিক মানের চেয়ে অনেক নিচে অবস্থান করায় সরকার বাধ্য হয়ে দেশি-বিদেশি খাত থেকে উচ্চ সুদে ঋণ গ্রহণ করছে, যা ঋণের বোঝা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতা ও অর্থ আটকে থাকার সংকট

বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও দুর্বল জায়গা হলো এর ব্যাংকিং ব্যবস্থা। ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের সুশাসনের অভাব, অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে বিপুল পরিমাণ অর্থ মন্দ ঋণ বা খেলাপি হিসেবে আটকে আছে। বছরের পর বছর আমানতকারীদের টাকা অনিয়মিত উপায়ে বিতরণ করায় ব্যাংকগুলোতে চরম তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। ব্যাংকগুলোর এই খেলাপি অর্থ উদ্ধার না হওয়া এবং মূলধন ঘাটতি পুরো অর্থব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে, যা বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহকেও আশঙ্কাজনকভাবে ব্যাহত করছে। অতিরিক্ত সংখ্যক সংস্কারের পরিবর্তে অগ্রাধিকারভিত্তিক ও বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কারের ওপর জোর দেওয়ার কথাও সেখানে বলা হয়েছে। ইসলাম ঋণ গ্রহণ নিষিদ্ধ করেনি; বরং ঋণ লেনদেনে স্বচ্ছতা, দায়িত্বশীলতা ও ন্যায়বিচারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

বৈদেশিক রিজার্ভের চাপ ও বৈশ্বিক প্রতিকূলতা

করোনা মহামারি পরবর্তী অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে দেশের ভেতরের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং পূর্বে নেওয়া বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধের চাপ বাংলাদেশের ডলার বাজারের ওপর অভূতপূর্ব সংকট তৈরি করে। এই বহুমাত্রিক প্রতিকূলতার ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আশঙ্কাজনক হারে কমে যায়, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করেছে। পরবর্তী সময়ে এই কর্মসূচির পরিমাণও বাড়ানো হয়। মূল্যস্ফীতির সময়ে কর বা জ্বালানি ব্যয় বাড়লে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে।

আইএমএফের সংস্কার শর্ত ও স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ

২০২৬ সালে আইএমএফের সাথে নতুন কর্মসূচি ও পরবর্তী কিস্তি নিয়ে আলোচনার সময় বেশ কিছু কঠোর সংস্কারের শর্ত সামনে আসে। আইএমএফের মূল্যায়নেও উঠে এসেছে যে যেকোনো অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি অবাস্তব না হয়ে বাস্তবসম্মত, দেশভিত্তিক, স্থানীয় প্রশাসনিক সক্ষমতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সামাজিক প্রভাব বিবেচনাসম্পন্ন হওয়া জরুরি। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, ১৯৯৭ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের সময় দক্ষিণ কোরিয়া আইএমএফের কঠোর শর্ত মেনে সংস্কার বাস্তবায়নের মাধ্যমে দ্রুত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার করতে পেরেছিল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই মুহূর্তটি কেবল ঋণ পাওয়ার ওপর নির্ভর না করে দেশের অভ্যন্তরীণ ভুল নীতিগুলো সংশোধন করা, সরকারি খরচ অনুৎপাদনশীল খাত থেকে সরিয়ে আনা এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার এক বিরাট ক্ষেত্র তৈরি করেছে। ন্যায়ভিত্তিক রাজস্বব্যবস্থার সঙ্গে এ পথটিই অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর