মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৫৯ অপরাহ্ন

বিদেশি বিনিয়োগে থাইল্যান্ডের অভাবনীয় সাফল্য: বাংলাদেশের করণীয় কী?

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৩২ সময় দেখুন

বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে থাইল্যান্ডের সাম্প্রতিক সাফল্য বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। থাইল্যান্ডের বিনিয়োগ বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটিতে বিভিন্ন খাতের ৩ হাজার ৩৭০টি প্রকল্পের বিপরীতে বিনিয়োগের আবেদন জমা পড়ে। এসব প্রকল্পে প্রস্তাবিত বিনিয়োগের সম্মিলিত পরিমাণ ছিল প্রায় ৬ হাজার ২৩ কোটি ডলার। লক্ষণীয় যে, ২০২৪ সালের তুলনায় এই বিনিয়োগ আবেদনের পরিমাণ ৬৭ শতাংশ বেশি, যা দেশটিতে বিনিয়োগের অভূতপূর্ব আগ্রহের প্রতিফলন। ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সভাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনার মধ্যে থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে এসব পরিসংখ্যান বিনিয়োগের আবেদন ও প্রস্তাবিত অর্থের পরিমাণ নির্দেশ করে, বাস্তবে সম্পন্ন হওয়া বিনিয়োগের পরিমাণ নয়।

বিনিয়োগের এই গতিধারা বছরের শুরু থেকেই ঊর্ধ্বমুখী ছিল। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই বিনিয়োগ উন্নয়ন সুবিধা পাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে যে পরিমাণ আবেদনের প্রস্তাবনা জমা পড়ে, তার মূল্য দাঁড়ায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি বাথ। এটি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৩৯ শতাংশ বেশি। বিনিয়োগের এই উল্লম্ফনে ডিজিটাল খাতের অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। শুধুমাত্র ডিজিটাল অবকাঠামো বা তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর খাতে বিনিয়োগ প্রস্তাবের মূল্য ছিল ৫২ হাজার ২৬০ কোটি বাথ। এছাড়া, ডেটা সেন্টার বা তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ২৮টি আলাদা প্রকল্প থেকে ৫২ হাজার ১২০ কোটি বাথের প্রস্তাব এসেছে, যা থাইল্যান্ডের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, উন্নত ইলেকট্রনিকস, তথ্যপ্রযুক্তি, তথ্যকেন্দ্র ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অবকাঠামোর মতো সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগ টানতে দেশটি পরিকল্পিতভাবে কাজ করছে। তবে দেশটির সাফল্যের মূল শিক্ষা শুধু বিনিয়োগের প্রস্তাব বাড়ানো নয়; বরং বিনিয়োগকারীদের জন্য কার্যকর পরিবেশ তৈরি এবং শিল্পনীতির সঙ্গে অবকাঠামো ও দক্ষ জনশক্তির সমন্বয় ঘটানো। এর লক্ষ্য শুধু বিদেশি কোম্পানিকে এনে কারখানা স্থাপন করানো নয়; বরং স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা, যন্ত্রাংশ উৎপাদন বাড়ানো, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।

থাইল্যান্ডের এই সাফল্যের সমান্তরালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করতে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। দেশের অর্থনীতিবিদ ও নীতি-নির্ধারকদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে বন্দর অবকাঠামোর উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। বন্দরের শুল্কায়ন প্রক্রিয়া ও পণ্য খালাসের সময়সীমা কমিয়ে আনা এবং শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে প্রধান পরিবহনপথ ও বন্দরের সংযোগ আরও আধুনিক করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তা সত্ত্বেও এগুলো দেখায়, ভবিষ্যৎ শিল্পের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে থাইল্যান্ড সক্রিয় রয়েছে।

প্রশাসনিক জটিলতা দূর করার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনো প্রকল্পের অনুমোদনের জন্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত না হলে, কেন দেরি হলো তার যৌক্তিক কারণ জানাতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ব্যবসায়িক বিরোধের ধীরগতি। এই সমস্যা নিরসনে চুক্তি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা প্রদান এবং বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তির একটি দ্রুত ও কার্যকর আইনি কাঠামো গড়ে তোলা অপরিহার্য বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রকল্পের ধরন ও যোগ্যতা অনুযায়ী করসুবিধা, যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কছাড় এবং অন্যান্য সহায়তাও রয়েছে।

বাংলাদেশের সাথে থাইল্যান্ডের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। তিনি জানান, থাই ব্যবসায়ীদের সাথে সাম্প্রতিক আলোচনায় বাংলাদেশের কৃষিজাত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং হালাল খাদ্য উৎপাদন শিল্পের সম্ভাবনা বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। থাই বিনিয়োগকারীরাও এসব খাতে বিনিয়োগে যথেষ্ট আগ্রহ দেখিয়েছেন। রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর আরও জানান, উভয় দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে রেনং বন্দর ও চট্টগ্রাম বন্দরের মধ্যে সরাসরি সামুদ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা জোরদার করার বিষয়েও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। উন্নত বন্দর সংযোগ স্থাপিত হলে তা দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রসারে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। অন্যদিকে, বাংলাদেশও থাইল্যান্ডের সঙ্গে যৌথ শিল্পায়ন, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালাল খাদ্য উৎপাদন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে চাইছে।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর