সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২৭ পূর্বাহ্ন

নেপথ্যের ‘ভাই’ ও চাঁদাবাজির মহামারি: জিম্মি জনজীবন

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৩২ সময় দেখুন

অপরিচিত কাউকে পেশা বা জীবিকা নিয়ে প্রশ্ন করলে এখন প্রায়ই পাওয়া যায় একই উত্তর—আমি অমুক ‘ভাই’য়ের সঙ্গে আছি। এলাকার মানুষ এই ‘ভাই’য়ের পরিচয় সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত। এদের কেউ মাস্তান, কেউবা নেতা হিসেবে পরিচিত। ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করাই তাদের প্রধান কাজ। এই চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক এতটাই শক্তিশালী যে পুলিশও এদের ধরতে গিয়ে বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দেয় বা উপরের মহলে রিপোর্ট করে যে, অভিযুক্তকে পাওয়া যাচ্ছে না। কেবল সাধারণ মানুষই নয়, শিল্পপতিরাও মাস শেষে তাদের কাছে সম্মানী পাঠাতে বাধ্য হন। আসলে ‘ভাই’ কী করেন এলাকার সবাই জানেন। বিখ্যাত চাঁদাবাজ হিসেবে তার নাম চারদিকে। উপরের তলায় খবর পাঠায়-স্যার, তাকে পাওয়া যাচ্ছে না।

চাঁদাবাজির এই নেটওয়ার্ক শহর থেকে শুরু করে গ্রামগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত। অনেক ব্যবসায়ী চাঁদাবাজদের ভয়ে এলাকাছাড়া বা ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রেও এই নেটওয়ার্ক সক্রিয়; ব্যাংক ম্যানেজারদের শাসিয়ে রাখা হয় যেন লোন প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপের খবর তাদের কাছে পৌঁছায়। ফুটপাথের হকার থেকে শুরু করে বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীদের প্রতিদিন একাধিক গ্রুপকে চাঁদা দিতে হচ্ছে। এমনকি স্কুল-কলেজের পরিবেশেও এই প্রভাব লক্ষণীয়। কিশোর গ্যাংয়ের মতো সংগঠনের আড়ালে অস্ত্র ও মাদকের কারবারও বাড়ছে, যা নিয়ে অভিভাবক মহলে তীব্র উদ্বেগ রয়েছে। ব্যাংক থেকে কবে, কখন, কাকে ঋণ দেয়া হচ্ছে এই নেটওয়ার্কও চাঁদাবাজদের নিয়ন্ত্রণে।

রাজনৈতিক সমর্থন ছাড়া এই চাঁদাবাজি সম্ভব নয় বলে মনে করেন অনেকে। তবে কেবল মাঠ পর্যায়ের নেতাই নন, বর্তমানে জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধেও দখলবাজির নানা অভিযোগ উঠছে। সম্প্রতি ঢাকায় একজন আইনপ্রণেতাকে তার কর্মকাণ্ডের কারণে সরিয়েও দেয়া হয়েছে। শিল্পাঞ্চলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এই পরিস্থিতির শিকার; তাদের মাসোহারা দেয়ার পাশাপাশি নিম্নমানের মালামাল কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে। রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনা প্রমাণ করে যে দখল ও ভাগাভাগির অসুস্থ প্রতিযোগিতা কতদূর পর্যন্ত গড়িয়েছে। নতুন কোনো শিল্পকারখানা গড়ার চেষ্টা করছেন না অনেকে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতির মূলে রয়েছে প্রশাসনিক দুর্বলতা। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন ‘ভাই’দের ইশারায় চলে। সহযোগিতা করতে অস্বীকার করলে কর্মকর্তাদের বদলি বা ওএসডি করার ভয় থাকে। টেন্ডার বাণিজ্য এখন চাঁদাবাজদের অন্যতম বড় উৎস। সংবাদমাধ্যমে কোনো কাজের বিজ্ঞপ্তি ছাপা হওয়া মাত্রই একাধিক গ্রুপ সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং কাজ পাওয়ার আগেই সমঝোতা করতে হয়। বালুমহাল, হাট-ঘাট ও ইজারার নিয়ন্ত্রণও এখন এই ‘ভাই’দের হাতে। অভিযোগ রয়েছে, এই অবৈধ আয়ের ভাগ অনেক ক্ষেত্রে ওপরের মহলেও পৌঁছায়।

চাঁদাবাজির এই ফরম্যাট সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন রূপ পেলেও সাধারণ মানুষের ভাগ্য বদলায় না। এমনকি শেষ জীবনে কবরস্থানের জায়গা পেতেও এই নেটওয়ার্কের অনুমতি নিতে হয়। পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, পরিস্থিতির পেছনে প্রমোশন ও পোস্টিং কেনাবেচার বড় ভূমিকা রয়েছে। এক পুলিশ কর্মকর্তা আক্ষেপ করে বলেন, যারা বড় অংকের বিনিময়ে পদায়ন পান, তারা সেই বিনিয়োগ ওঠাতে চাঁদাবাজদের সঙ্গে আঁতাত করতে বাধ্য হন। ফলে আইনের শাসনের বদলে এক ধরনের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। কথায় কথায় একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলছিলেন, ‘আপনারা সবসময়ই আমাদের দোষারোপ করেন।

বিদেশে গমনেচ্ছু বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র—ছাড়পত্র পেতে মোটা অংকের টাকা গুনতে হয়। অপরাধের ধরনও এখন বদলেছে; আগে ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে লেনদেন হলেও এখন ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে ঝুঁকিহীন ও আড়ালে লেনদেন বেড়েছে। ছিনতাই ও রাহাজানি নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় এই নেটওয়ার্ক সচল থাকলেও ‘দেখেও না দেখার’ ভান করার দায় মূলত সেই দুর্নীতিগ্রস্ত কাঠামোর ওপরই বর্তায়। বলেন, আমরা দেখেও নাকি দেখি না। শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জে সব জায়গাতে একই চিত্র।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর